অভ্যুত্থানে নিহত রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা শতাধিক মরদেহের মধ্যে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে রায়েরবাজার কবরস্থান এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য জানানো হয়।
সেখানে আট ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণ কার্যক্রম ও তার ফলাফল উপস্থাপন করেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, মিনেসোটা প্রটোকল মেনে এখানে কবরস্থ হওয়া ১১৪ জনের লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে শনাক্ত আটজন জুলাই যোদ্ধার পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
আরো একজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম একসঙ্গে এতসংখ্যক মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের ঘটনা।
রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১৪টি লাশ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলে সিআইডির ফরেনসিক দলের নেতৃত্বে। লাশ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং ফের কবরস্থ করার প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সরকারী সায়েদুর রহমান, পুলিশের আইজি বাহারুল আলম, সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের কবরগুলোকে তাদের স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া আটজন হলেন—
- মো. মাহিন মিয়া (৩০), জন্ম ১৯৯৪ সালে। মাহিন মারা যান ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। বাবা গাজী মামুদ, মা জোসনা বেগম। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর থানার ফুলপুর গ্রাম।
- আসাদুল্লাহ (৩১), জন্ম ১৯৯৩ সালে। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। বাবা মৃত আব্দুল মালেক এবং মায়ের নাম আশেয়া বেগম। আসাদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী থানায়।
- পারভেজ বেপারী (২২)। ২০০২ সালে জন্ম নেওয়া পারভেজ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। বাবা সবুজ বেপারী ও মা শামসুন্নাহার। পারভেজের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বারোহাটিয়া গ্রামে।
- রফিকুল ইসলাম (৫১), জন্ম ১৯৭৩ সালে। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। তার বাবার নাম মৃত আব্দুল জব্বার শিকদার। রফিকুল ইসলামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর থানার সাতকাছিনা গ্রামে।
- সোহেল রানা (৩৭), জন্ম ১৯৮৭ সালে। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। বাবা মৃত মো. লাল মিয়া ও মা রাশেদা বেগম। তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানায়।
- রফিকুল ইসলাম (২৮)। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণ মারা যান ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। তার বাবা নাম মৃত খোরশেদ আলম। রফিকুলের বাড়ি ফেনী জেলায়।
- ফয়সাল সরকার (২৫), জন্ম ১৯৯৯ সালে। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ২২ জুলাই। ফয়সালের বাবার নাম শফিকুল ইসলাম এবং গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার কাচিমারা গ্রামে।
- কাবিল হাসান (৫৮)। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ২ আগস্ট। বাবা মৃত বুলু মিয়া, মায়ের নাম ছামেনা বেগম। তার বাড়ি ঢাকার মুগদা থানার গলিতে।
পরিচয় শনাক্তকরণের এই কাজটি সম্পন্ন করতে সিআইডির ফরেনসিক টিমগুলো অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছে বলে জানান উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘এখানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া জুলাই যোদ্ধাদের পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্র তার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করে। সেই গুরুদায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই অজ্ঞাতনামা শহিদদের পরিচয় শনাক্তকরণে একটি পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।’
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, ‘এই শনাক্তকরণের ফলে শহিদদের পরিবারগুলো অন্তত জানতে পারছে তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে বা তারা কোন স্থানে শায়িত আছে। এটা তাদের জন্য ও জাতির জন্য এক বিরাট মানসিক শান্তির কারণ।’
সিআইডি প্রধান ছিবগাত উল্লাহ জানান, ওই সময় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম যে ১১৪ টি লাশ দাফন করেছিল সেগুলো উত্তোলন করে এই আটজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই ১১৪ জনের মধ্যে রোড অ্যাকসিডেন্টসহ আরও অনেকভাবে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা ছিলেন। আমরা অনেকগুলো লাশের শরীরে বুলেটের পিলেট (গুলি) পেয়েছি। এগুলো নিয়ে আমাদের বড় প্রকাশনা হবে।’