মৃত্যুর পর মানুষের কবরে কী ঘটে? — ইসলাম যা বলে
মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অনিবার্য সত্য। জন্মের পর যেমন জীবনের সূচনা হয়, তেমনি একদিন প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, "তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই; যদি তোমরা সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দুর্গেও অবস্থান কর।" (সুরা আন-নিসা: ৭৮)
ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মৃত্যু কোনো কিছুর সমাপ্তি নয়; বরং এটি অনন্ত জীবনের সূচনা। মৃত্যুর পর শুরু হয় বরযখের জীবন, যার প্রথম ধাপ হলো কবর।
মুমিনের মৃত্যুর মুহূর্ত
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যখন কোনো ঈমানদার বান্দার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে উজ্জ্বল চেহারার ফেরেশতারা জান্নাতের কাফন ও সুগন্ধি নিয়ে উপস্থিত হন। এরপর মৃত্যুর ফেরেশতা কোমল ভাষায় বলেন—
"হে পবিত্র আত্মা! তুমি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো।"
তখন মুমিনের রূহ অত্যন্ত সহজে দেহ থেকে বেরিয়ে আসে। ফেরেশতারা সেই রূহকে জান্নাতের সুগন্ধিময় কাফনে আবৃত করে আসমানের দিকে নিয়ে যান। আসমানের ফেরেশতারা তাকে সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানান এবং সপ্তম আসমানে পৌঁছে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তার আমলনামা ইল্লিয়্যিনে সংরক্ষণ করা হয়।
কবরে শুরু হয় প্রশ্নোত্তর
এরপর রূহকে পুনরায় দেহের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। তখন দুই ফেরেশতা—মুনকার ও নাকীর—মৃত ব্যক্তিকে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন:
তোমার রব কে?
তোমার দ্বীন কী?
তোমাদের কাছে প্রেরিত ব্যক্তি কে?
একজন মুমিন উত্তর দেন—
আমার রব আল্লাহ, আমার দ্বীন ইসলাম এবং আমার নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
তখন আকাশ থেকে ঘোষণা আসে, "আমার বান্দা সত্য বলেছে।" এরপর তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দেওয়া হয়, জান্নাতের একটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তার কবর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হয়।
নেক আমল সঙ্গী হয়ে আসে
হাদিসে আরও এসেছে, কবরে একজন সুদর্শন, সুগন্ধিময় ব্যক্তি এসে মুমিনকে সুসংবাদ দেন। তিনি পরিচয় দেন—
"আমি তোমার নেক আমল।"
অর্থাৎ দুনিয়ার সৎকর্মই কবরে মানুষের প্রকৃত সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
মুমিনের বিশেষ আকাঙ্ক্ষা
কবরের নেয়ামত লাভ করার পর মুমিনের অন্তরে একটি আকাঙ্ক্ষা জাগে। তিনি বারবার প্রার্থনা করতে থাকেন—
"হে আমার রব! কিয়ামত কায়েম করুন। কিয়ামত ঘটিয়ে দিন, যাতে আমি আমার পরিবার-পরিজন এবং জান্নাতের প্রতিদানের কাছে পৌঁছতে পারি।"
এটি একজন মুমিনের জন্য সুসংবাদের প্রতীক। কারণ তিনি আল্লাহর রহমত ও চূড়ান্ত পুরস্কারের অপেক্ষায় থাকেন।
মৃত্যুর শিক্ষা
ইসলাম মানুষকে মৃত্যুভীতি নয়, বরং মৃত্যুর প্রস্তুতির শিক্ষা দেয়। বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা, নেক আমল করা, আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা এবং রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত প্রস্তুতি।
আলেমরা বলেন, কবর হবে মানুষের জন্য হয় জান্নাতের একটি বাগান, নয়তো জাহান্নামের একটি গর্ত। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আখিরাতের সফলতার জন্য কাজে লাগানোই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করার, উত্তম মৃত্যুবরণ করার এবং কবর ও আখিরাতের কঠিন পরীক্ষায় সফল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সম্পাদনায়
শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল
সিনিয়র সাংবাদিক