স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদ: শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূল্যায়ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের নাম উচ্চারিত হলেই দেশের স্বাধীনতা, সংকটকালীন নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। শহীদ রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman তেমনই এক আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার ধরণ এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে স্মরণ করা নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে পুনরায় মূল্যায়ন করা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই যুদ্ধে একজন সাহসী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে তাঁর নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর নেতৃত্ব ও সাহসিকতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন এবং দৃঢ়।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত, তখন দেশকে স্থিতিশীল করার প্রশ্ন সামনে আসে। এমন এক বাস্তবতায় শহীদ জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে একটি দেশ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়; প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনগণকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। তাই তিনি কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো এবং গ্রামীণ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক নয়; বরং স্বাধীন ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণের মধ্যে আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রীয় চেতনার নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা দেয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও শহীদ জিয়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করেন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। খাল খনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করার উদ্যোগ তাঁর সময়েই ব্যাপক গুরুত্ব পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের উন্নয়নের মূল শক্তি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাই জনগণকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে তিনি বিশেষভাবে উৎসাহ দেন।
রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও শহীদ জিয়ার ভূমিকা আলোচিত। একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে তিনি রাজনৈতিক বহুমত ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত করেন। সংবাদপত্র, রাজনৈতিক সংগঠন ও জনগণের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ ছিল। যদিও তাঁর শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তবুও অনেক বিশ্লেষকের মতে বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও শহীদ জিয়া বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। মুসলিম বিশ্ব, দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তাঁর সময়েই আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ধারণা গুরুত্ব পায়, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
তবে একজন রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়ন সবসময় একমুখী হয় না। শহীদ জিয়ার শাসনকাল নিয়েও নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও মতভেদ রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামরিক শাসনের প্রভাব এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু এটাও সত্য যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ও জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দর্শন এখনও দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁর শাহাদাত বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতার সৃষ্টি করে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তাঁর নাম, রাজনৈতিক আদর্শ ও রাষ্ট্রচিন্তা এখনও আলোচনায় রয়েছে। ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ হলো দেশের স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবা।
আজকের বাংলাদেশ উন্নয়ন, গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও জাতীয় ঐক্যের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের ইতিবাচক দিকগুলো মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। দেশপ্রেম, আত্মনির্ভরশীলতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে বার্তা তিনি দিয়েছিলেন, তা এখনও প্রাসঙ্গিক।
শহীদ জিয়া ছিলেন একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সৈনিক, অন্যদিকে রাষ্ট্রগঠনের একজন বাস্তববাদী চিন্তক। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান, রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা ভবিষ্যতেও চলবে। কারণ ইতিহাসে কিছু মানুষ কেবল একটি সময়ের নন, তারা হয়ে ওঠেন একটি রাষ্ট্রের চলমান রাজনৈতিক ও জাতীয় আলোচনার অংশ।
শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল
সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট