বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব: সোমালিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আসিফ মিজান
ঢাকা- স্টাফ রিপোর্টার:
সোমালিয়ার মোগাদিশুর বিখ্যাত 'দারু সালাম ইউনিভার্সিটি' (ডিএসইউ)-র উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. শেখ আসিফ এস. মিজান। আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রশাসনের এই সর্বোচ্চ চূড়ায় লাল-সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্বকারী অধ্যাপক মিজানের এই শীর্ষ অবস্থান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মেধা ও নেতৃত্বের এক অনন্য গৌরবগাথা। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি বিদেশের মাটিতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছেন। উল্লেখ্য যে, ফেব্রুয়ারি ২০২৪ থেকে তিনি সাফল্যের সাথে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য দক্ষতা ও সুনামের সাথেই পালনে করে চলছেন।
গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষাজীবন ও পাণ্ডিত্য
ড. মিজানের এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছে তাঁর অসামান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞা ও দক্ষতার ওপর। তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সরকার ও রাজনীতি' বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। দেশ-বিদেশের উচ্চশিক্ষা ইন্সটিটিউট থেকে তিনি অর্জন করেছেন তিনটি স্নাতকোত্তর (MSS, MACPM ও MIR&D) এবং 'সুশাসন ও মানবাধিকার' বিষয়ের ওপর পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তাঁর শিক্ষকতা জীবনে তিনি সুশাসন, মানবাধিকার ও অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) মতো জটিল বিষয়ে পাঠদান ও গবেষণামূলক অবদান রেখে চলেছেন।
সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা
অধ্যাপক মিজানের এই বর্ণিল সাফল্যগাথা স্রেফ এক দিনে আসেনি, এর পেছনে রয়েছে এক কঠিন রাজনৈতিক ত্যাগ ও লড়াইয়ের ইতিহাস। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কারণে তিনি তীব্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। এর জের ধরে ২০০০ সালে তাঁকে অপহরণের চেষ্টা করা হয় এবং পরবর্তীতে একের পর এক মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হয়ে, চরম নিপীড়নের মুখে ২০১৯ সালে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বিশ্বমঞ্চে পদচারণা ও সমাজসেবা
রাজনৈতিক নির্বাসনে গিয়েও দমে যাননি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাংতা গ্রামের এই কৃতি সন্তান। প্রয়াত শিক্ষাবিদ মৌলভি জোবায়েদ আলী ও নূরজাহান বেগমের সুযোগ্য পুত্র ড. মিজান বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মেধার পরিচয় দিতে শুরু করেন। ডিএসইউ-এর উপাচার্য হওয়ার আগে তিনি সোমালিয়ার সিটি ইউনিভার্সিটি অব মোগাদিশু এবং বাংলাদেশের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যথাক্রমে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং সরকার ও রাজনীতি বিভগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি সোমালিয়ার আলফা ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ব্যুরোতেও অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি একজন সমাজসেবক হিসেবে তিনি 'রোটারি ক্লাব অব ঢাকা স্কলারস'-এর প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-সম্পাদকের ভূমিকাও পালন করছেন।
মানবতা ও তরুণদের প্রতি বার্তা
নিজের এই দীর্ঘ অভিযাত্রাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক পরম বিজয় উল্লেখ করে অধ্যাপক মিজান বলেন, "স্বৈরাচার যেখানে আমার কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, সৃষ্টিকর্তা সেখানে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার পথ খুলে দিয়েছেন।" দেশ-বিদেশের তরুণ সমাজ ও বিশ্বজুড়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশ্যে এক অনুপ্রেরণামূলক বার্তায় তিনি আহ্বান জানান, কোনো জুলুম, নির্বাসন বা কঠিন পরিস্থিতি যেন কারও স্বপ্নের সীমানা কেড়ে নিতে না পারে। আত্মবিশ্বাস ও মেধাকে শাণিত রেখে সবাইকে মানবকল্যাণে উৎসর্গীকৃত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এশিয়া ও আফ্রিকার সহকর্মী এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরার এই মহৎ মিশন কেবল শুরু।