সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির বিচার ও আইনি সুরক্ষা: সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ কি অপরাধের চিরস্থায়ী লাইসেন্স?- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১২:৪৪ অপরাহ্ন, ২৭ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২:৪৪ অপরাহ্ন, ২৭ জুলাই ২০২৬



রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনতান্ত্রিক পদ ‘রাষ্ট্রপতি’। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি পদটি একক কোনো ব্যক্তির নয়, বরং সংবিধান ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালনকালে কোনো ফৌজদারি অপরাধের জন্য জবাবদিহিতা বা আদালতের মুখোমুখি হওয়া থেকে সাময়িক সুরক্ষা লাভ করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনি দর্শন ও সাংবিধানিক রাজনীতির আলোকে আজ এ প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে উঠেছে- এই ‘আইনি সুরক্ষা’ কি কোনো ব্যক্তিকে যেকোনো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় থেকে চিরতরে মুক্তি দেয়, নাকি এটি স্রেফ পদের মর্যাদা রক্ষার জন্য একটি সাময়িক অধিকার (Procedural Immunity)?


সম্প্রতি সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির গ্রেফতার ও বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল রাজনৈতিক ক্ষোভ নয়; বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে আইনের শাসন (Rule of Law) এবং সাংবিধানিক সততার (Constitutional Integrity) মূল ভিত্তি।


সাংবিধানিক সুরক্ষার সীমা এবং ৫১(১) অনুচ্ছেদের ব্যবচ্ছেদঃ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে—দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো ফৌজদারি কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না এবং তাঁকে গ্রেফতার বা কারারুদ্ধ করা যাবে না।


কিন্তু আইনের শাসনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি (Rule of Law Doctrine) এবং তুলনামূলক শাসনতন্ত্রের (Comparative Constitutional Law) সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিচার করলে দেখা যায়:


১. সরকারি কাজ বনাম ব্যক্তিগত অপরাধ (Official Acts vs. Personal Crimes): একজন রাষ্ট্রপতি তাঁর রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য সুরক্ষার দাবিদার হতে পারেন। কিন্তু দায়িত্বে থাকাকালীন বা দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বে যদি তিনি কোনো জঘন্যতম ব্যক্তিগত অপরাধ বা রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তবে সংবিধানিক সুরক্ষা তাঁর জন্য ‘চিরস্থায়ী ঢাল’ হতে পারে না।


২. পদ পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া (Post-Tenure Prosecution): সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে কেবল পদে আসীন থাকা অবস্থায় সুরক্ষার কথা বলে। পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে যদি অতীত বা পূর্ববর্তী কোনো অপরাধের সুনির্দিষ্ট আলামত ও প্রমান থাকে, তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে সংবিধানে কোনো বাধা থাকে না।


৩. রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বের অপরাধ: মহামান্য রাষ্ট্রপতি পদে বসার আগে সংঘটিত যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে পদে আসীন থাকা অবস্থায় বিচার স্থগিত থাকলেও, পদত্যাগের বা মেয়াদ শেষের পর তাঁর বিচার হওয়া আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া।


আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও উদাহরণঃ

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনি ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধানদের আইনি সুরক্ষা কখনোই অপরাধের অনাক্রম্যতা (Absolute Immunity) হিসেবে গণ্য হয়নি।


যুক্তরাষ্ট্রের নজির: মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট Nixon v. Fitzgerald (1982) এবং সাম্প্রতিক Trump v. United States (2024) মামলায় সুস্পষ্ট করেছে যে, রাষ্ট্রপ্রধানের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত অপরাধ সম্পূর্ণ পৃথক। অপরাধমূলক কাজের জন্য পদচ্যুতির পর সাধারণ আদালতের মুখোমুখি হওয়া আইনের স্বাভাবিক নীতি।


ফ্রান্সের উদাহরণ: ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী পদে থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি সুরক্ষা পান। তবে পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঠিক এক মাস পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে যেকোনো ফৌজদারি তদন্ত পুনরায় চালু করার বিধান রয়েছে। সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ও জ্যাক শিরাকের বিচার এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ।


দক্ষিণ কোরিয়া ও পেরু: রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও দুর্নীতির দায়ে রাষ্ট্রপ্রধান পদে থাকা স্বত্বেও এবং পদ ছাড়ার পরপরই আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন বহু সাবেক প্রেসিডেন্ট।


অতএব, বৈশ্বিক আইনি চর্চা এটাই প্রমাণ করে যে, সংবিধান কখনো কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না।


বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংবিধানিক সংকটের গতিপথঃ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটপরিবর্তনে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নানা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এক চরম স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দেওয়া এবং সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে নাগরিক সমাজে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।


পরবর্তী সময়ে, চরম জাতীয় সংকটে রাষ্ট্রব্যবস্থার ধস রোধে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তিনি সংবিধান ধরে রাখার যে চেষ্টা করেছেন—এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকারের সাথে সহযোগিতামূলক অবস্থান নিয়েছেন—তা রাজনৈতিক বাস্তবতার বিচারে একটি স্বস্তিদায়ক ভূমিকা হতে পারে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা বা সংকটকালীন কৌশলগত ভূমিকা কখনোই অতীত অপরাধের ‘আইনি মাফ’ হতে পারে না।


রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার পূর্বে যদি কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রবিরোধী, গণবিরোধী বা জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত থেকে থাকেন, তবে তার সঠিক বিচার নিশ্চিত করাই ন্যায়বিচারের মূল সত্য। অপরাধের দায়ে যদি কোনো সাবেক প্রধান নাগরিক শাস্তি না পান, তবে তা ভবিষ্যতে অন্য কুচক্রী ও স্বৈরাচারী দোসরদের অপকর্ম করার সাহস জোগায়।


"আইনের অসীম শাসনের ভিত্তি এখানেই—কেউ আইনের চেয়ে বড় নয়, আবার কেউ আইনের সুরক্ষার বাইরেও নয়। রাষ্ট্রপতির পদটি শ্রদ্ধার, কিন্তু সে পদের আড়ালে অপরাধ লুকিয়ে রাখার সুযোগ সংবিধান দেয় না।"


অতএব, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদের অপব্যবহার বন্ধ করতে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি পদটিকে যেকোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার থেকে রক্ষা করতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা ও উচ্চ আদালতের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।


সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির অতীত অপরাধ ও বিতর্কিত ভূমিকার সঠিক, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে। বিচার বিভাগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবেই বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব পূর্ণতা পাবে। অপরাধী যে-ই হোক, পদমর্যাদা নির্বিশেষে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই হলো নতুন বাংলাদেশের মূল গণদাবি।


লেখকঃ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।