কোনোভাবেই আমি প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু না: প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘আমি কোনোভাবেই আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বন্ধু না। আমি বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছি।’
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) সংলাপে এ কথা বলেন তিনি। বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপ সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আমার সম্পর্ককে ‘বন্ধুত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। আমি আপনাদের মাধ্যমে আবারও বিনয়ের সাথে অনুরোধ করি যে এই বিষয়টি কখনোই কেউ নজরে নিয়ে আসবেন না। কোনো কারণে, কোনোভাবেই আমি আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বন্ধু না
তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) ও তার পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ক্ষমতায় আসার পরও তার পরিবারকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে যোগ্যতার ভিত্তিতে তার পরিবারের সদস্যরা কোনো দায়িত্ব পেলে সেটিকে অযথা বিতর্কিত না করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘শ্রদ্ধেয় নেতা তারেক রহমানের বাড়ি বগুড়া। বিএনপির কর্মী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে বগুড়া জেলার দায়িত্ব পালন করার কারণে তার সাথে বহুবার আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, দেখা হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই তিনি আমাদেরকে স্নেহ করেন এবং বিভিন্ন সময় পরামর্শ দেন।‘
শাহে আলম বলেন, ‘বগুড়ার মানুষ হিসেবে এইটুকু যোগাযোগ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার আছে। তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, জানেন। এইটুকুই তার সাথে আমার সম্পর্ক। তার সাথে আমার বয়সের অনেক তারতম্য রয়েছে।’
সব মিলিয়ে এই যে মানুষের সামনে যদি এটা উপস্থাপন করেন যে তারেক রহমানের বন্ধু মীর শাহে আলম এটা করেছেন, ওটা করেছেন... এই জিনিসটা আমি এবং আমার পরিবার বা সমাজের অন্য মানুষ নিশ্চয়ই ভালোভাবে নেবেন না,’ যোগ করেন শাহে আলম।
তিনি বলেন, ‘শ্রদ্ধেয় তারেক রহমান বড় হয়েছেন, পড়াশোনা করেছে ঢাকা শহরে। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা বগুড়া এবং শিবগঞ্জে। উনার সঙ্গে আমার রাজনৈতিকভাবে সাক্ষাতই হয়েছে ৯৩-৯৪ সালে, আমি ছাত্রদলের সেক্রেটারি হওয়ার পরে... যখন উনি বগুড়া যাওয়া আসা শুরু করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আপনাদের মাধ্যমে আবারও বিনয়ের সাথে অনুরোধ করি যে এই বিষয়টি কখনোই কেউ নজরে নিয়ে আসবেন না যে প্রধানমন্ত্রী আমার বন্ধু। অনুগ্রহপূর্বক এই বিষয়টা থেকে আপনারা একটু দূরে থাকবেন বা সবাইকে সজাগ করবেন, এইটুকু আমি অনুরোধ করছি।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু করা চ্যালেঞ্জের’
বিএসআরএফ আয়োজিত সংলাপে নিজ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে তিনি স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছেন। গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত মন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে হওয়ায় তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করেন বলেও উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন আয়োজনের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তার ছেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পর সমালোচনা শুরু হলে আমি নিজেই ছেলেকে পদত্যাগের পরামর্শ দিই। প্রথম বোর্ড সভার পরদিনই আমার ছেলে পদত্যাগ করে। তবে বিষয়টি গণমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ইউনিয়নের নাম, প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
এর আগে গত ১৫ জুন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের নির্বাচনি এলাকায় তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে জাতীয় সংসদে সমালোচনা হয়। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের এলাকায় একটি ইউনিয়নে তার মীর বংশের নামে ‘মীরবাড়ি’ নামে নামকরণ করেছেন। তার দুই সন্তান দিগন্ত ও সীমান্তের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।”
এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন সংসদ ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি ইউনিয়নের নামকরণের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, তার সন্তানের নামের সঙ্গে মিল রেখে নয়, একটি ইউনিয়ন দুটি উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় ‘সীমান্ত’ এবং আরেকটি দূরবর্তী হওয়ায় ‘দিগন্ত’ নাম রাখা হয়েছে।
সাংবাদিক কারাগারে, প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার পর স্থানীয় একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের নামে মামলা করেছিলেন স্থানীয় আরেকজন সাংবাদিক এবং তাকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছিল। এই মামলায় স্থানীয় মোট ছয়জন সাংবাদিককে আসামি করার তথ্য দিয়েছিল পুলিশ।
এই ঘটনা নিয়ে সমলোচনা তৈরি হলে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বা তার পক্ষে দাবি করে কেউ যেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো মামলা, বিবৃতি বা অন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন। এ ধরনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর কোনো অনুমোদন বা নির্দেশনা নেই।’
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ বিতর্ক
শিবগঞ্জ উপজেলার একটি স্কুলের নাম পরিবর্তন করে প্রতিমন্ত্রীর নামে নামকরণে প্রস্তাব করলে এ নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক চিঠিতে ৫৩ বছরের প্রাচীন শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তবে শিক্ষা সচিবের কাছে পাঠানো এক পত্রে এই প্রস্তাব নাকচ করেছেন শাহে আলম। তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তার একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বগুড়ার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রতিমন্ত্রী তার নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ না নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন।
ওই চিঠিতে তিনি তার নামে থাকা দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে বলেন, ‘এর বাইরে তার বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব যেন গ্রহণ বা অনুমোদন না করা হয়।’