তারেক রহমানের প্রথম মালয়েশিয়া ও চীন সফর: বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন অধ্যায় নাকি সম্ভাবনার সূচনা?

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১০:০২ অপরাহ্ন, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, ৩০ জুন ২০২৬


প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর যেকোনো রাষ্ট্রনেতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথম সফর সাধারণত নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত অবস্থানের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার, আর চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ও অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ফলে এই দুই দেশকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—উভয় বিবেচনায়ই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

মালয়েশিয়া সফরের প্রধান অর্জন

মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং দুটি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে সংস্কৃতি, সন্ত্রাসবাদবিষয়ক গবেষণা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য।

তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি। এতে ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।

এছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সবুজ প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বাংলাদেশের আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার সমর্থনও বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

চীন সফরের তাৎপর্য

চীন সফরে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসবের আওতায় রয়েছে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, কৃষিপণ্য রপ্তানি, সবুজ উন্নয়ন, ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষা, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ।

যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও উন্নয়নের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিল্পায়ন, উচ্চপ্রযুক্তি এবং সবুজ উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, ওষুধ, মৎস্য ও চামড়াজাত পণ্যের জন্য চীনা বাজার আরও সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

তিস্তা প্রকল্পে নতুন সম্ভাবনা

সফরে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ ব্যবস্থায় চীনের সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে প্রকল্পের অর্থায়ন বা বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। ফলে এটিকে সম্ভাবনার সূচনা বলা গেলেও এখনই বাস্তব অর্জন বলা যাবে না।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের দিক

চীনে অনুষ্ঠিত "ইনভেস্ট বাংলাদেশ" সম্মেলনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে এবং বহু চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সামনে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর-সুবিধা এবং দ্রুত অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ, উল্লেখযোগ্য ঋণ কিংবা নির্দিষ্ট বাজার সুবিধার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে এ সফরের অর্থনৈতিক সুফল ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।

সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা

সফরের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। একইভাবে চীনের কাছ থেকে বড় বিনিয়োগ, তিস্তা প্রকল্পের অর্থায়ন কিংবা বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মতো দৃশ্যমান সিদ্ধান্তও এখনো হয়নি।

এ কারণে অধিকাংশ অর্জন বর্তমানে সমঝোতা স্মারক, যৌথ বিবৃতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির পর্যায়েই রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই হবে সফরের প্রকৃত সফলতার মাপকাঠি।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি এবং চীনের সঙ্গে একাধিক সমঝোতা স্মারক ও বিস্তৃত যৌথ বিবৃতি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরি করেছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক বা যৌথ ঘোষণা চূড়ান্ত সাফল্য নয়; এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই প্রকৃত ফলাফল আসে। আগামী মাস ও বছরগুলোতে যদি ঘোষিত উদ্যোগগুলো বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৃদ্ধি, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান অবদান রাখতে পারে, তাহলে এই সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি বাস্তবায়ন ধীরগতির হয়, তাহলে এটি সম্ভাবনাময় হলেও সীমিত বাস্তব অর্জনের একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেই মূল্যায়িত হবে।

সবশেষে বলা যায়, এই সফর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তবায়নের মাধ্যমে।



শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল 

সিনিয়র সাংবাদিক,লেখক ও সম্পাদক