ফ্যাসিবাদের অদৃশ্য ডালপালা: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কি ঝুঁকিমুক্ত? - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
নেটের দুনিয়ায় এখন একটি খবরই সবচেয়ে বেশি ভাসছে—বিদেশে পালিয়ে থাকা অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ অবশেষে ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অবধারিতভাবে এটি জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটের পক্ষে একটি বড় আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।
কিন্তু একজন অপরাধবিজ্ঞানী (Criminologist) ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে যখন ক্ষমতার গভীর স্তরগুলো এবং সমসাময়িক অপরাধচিত্র পর্যবেক্ষণ করি, তখন এই একটি ‘বেনজীর’ গ্রেপ্তারের আলোড়নে মন পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারে না। কারণ, অপরাধবিজ্ঞানের সুপরিচিত 'অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড সিন্ডিকেশন’ (Organized Crime Syndication) তত্ত্ব অনুযায়ী, দৃশ্যমান অপরাধের মূল হোতা বা ‘কিংপিন’ (Kingpin) অপসারিত হলেও তার তৈরি করা গভীর প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং অপরাধের দোসররা সুযোগ পেলেই ভিন্ন অবয়বে নিজেদের পুনর্বাসন করে।
অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মূল চেতনাকে নস্যাৎ করতে ফ্যাসিবাদের সেই অদৃশ্য ডালপালাগুলো এখন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুসংগঠিত উপায়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় পুনর্বাসিত হচ্ছে। বড় বেনজীরদের অধ্যায় আপাতদৃষ্টিতে শেষ মনে হলেও, শত শত ‘ছোট বেনজীর’ বা ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী কুশীলবরা এখন রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসছে। সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কার জায়গা হলো, এই অনুপ্রবেশের থাবা এখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ক্ষমতার এই শীর্ষ কেন্দ্রটি কি আসলে ঝুঁকিমুক্ত?
নীতিবিচ্যুতি ও তৃণমূলের পুঞ্জীভূত ক্ষোভঃ
সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের নানামুখী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি বিশেষ সুবিধাবাদী চক্রের সহায়তায় ফ্যাসিবাদের গর্ভে লালিত আমলারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রে আসীন হতে শুরু করেছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং আত্মঘাতী যে, বিএনপি নামধারী কিছু অতি-উৎসাহী বা নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তি নিজেদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত আখের গোছাতে এদেরকে হাতে ধরে রাষ্ট্রের শীর্ষ দফতরগুলোতে বসাচ্ছেন। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইনসাইডার থ্রেট’ (Insider Threat) বা প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যন্তরের গোপন শত্রু।
এই সুবিধাবাদী চক্রের কারণে খোদ তৃণমূল বিএনপিতে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের আগুন জ্বলছে।
ত্যাগের অবমূল্যায়ন: যে তৃণমূল কর্মীরা দীর্ঘ ১৫ বছর রাজপথে ফ্যাসিবাদী সরকারের অবর্ণনীয় জুলুম, মিথ্যা মামলা, হুলিয়া এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন, তারা যখন দেখেন যে তাদেরই দলের কিছু নেতার প্রশ্রয়ে ফ্যাসিবাদের দোসররা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো অতি-গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বহাল তবিয়তে পুনর্বাসিত হচ্ছে, তখন তাদের সেই দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আনুগত্য চরম উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়।
স্থিতিশীলতার সংকট: তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকা তৃণমূলের এই ক্ষোভ যেকোনো সময় দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
ক্রিমিনাল ইনফিলট্রেশন' ও জাতীয় নিরাপত্তার তিন টেকনিক্যাল ঝুঁকিঃ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কেবল রাজনৈতিক অসন্তোষেরই জন্ম দিচ্ছে না, বরং অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাষ্ট্র এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এক চরম এবং অপরিসীম সংকট তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হলো রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সমন্বয়ের প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র (Nerve Center)।
অপরাধবিজ্ঞানের ‘ক্রিমিনাল ইনফিলট্রেশন’ (Criminal Infiltration) বা অপরাধমূলক অনুপ্রবেশ তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অনুগত ও সুবিধাভোগী অংশ কোনো নতুন শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে ঢুকে পড়ে, তখন তারা মূলত তিনটি বড় ধরনের স্ট্র্যাটেজিক ও টেকনিক্যাল ঝুঁকি তৈরি করে:
| ঝুঁকির ধরন | বিবরণ ও সম্ভাব্য প্রভাবঃ
| ১. তথ্য পাচার ও গোয়েন্দা ঝুঁকি (Information Leakage & Espionage) | রাষ্ট্রের অতি-গোপনীয় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য প্রতিবিপ্লবী শক্তির কাছে পাচার হওয়া। |
| ২. policy বা নীতিগত অন্তর্ঘাত (Policy Sabotage) | সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতিনির্ধারণে ভেতর থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং জনমনে ক্ষোভ উসকে দেওয়া। |
| ৩. কৌশলগত অরক্ষিততা (Tactical Vulnerability) | সুযোগ বুঝে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয়কে (Security Perimeter) অরক্ষিত বা দুর্বল করে ফেলা। |
যে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে ছাত্র-জনতা রাজপথে রক্ত দিয়ে তাড়িয়েছে, তাদেরই বিশ্বস্ত অনুচরেরা যদি প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে দেয়াল তুলে দাঁড়ায়, তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিদিনের রুটিন, মুভমেন্ট এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো এক অদৃশ্য ব্ল্যাকমেইলিং ও গভীর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে। এই ধরনের কৌশলগত অবস্থান থেকে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রশাসনিক অভ্যুত্থান বা ‘ইনসাইডার অ্যাটাক’ (Insider Attack)-এর আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়—যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
শহীদান ও আহতদের রক্তের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতাঃ
সবচেয়ে বড় মনোবেদনা ও নৈতিক সংকটের জায়গাটি তৈরি হয় যখন আমরা সেইসব বীরদের দিকে তাকাই, যারা নিজেদের জীবন বা পঙ্গুত্বকে বাজি রেখে এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছেন।
গুলির মুখে বুক পেতে দাঁড়িয়ে যে তরুণটি ফ্যাসিস্ট তাড়ালো, যে পরিবারটি তাদের একমাত্র প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে আজ নিঃস্ব, কিংবা যে ভাই-বোনটি পঙ্গুত্ব বরণ করে আজও হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন—তাদের এই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন কোথায়?
যখন এই হতভাগ্য পরিবারগুলো ও চিকিৎসাধীন বিপ্লবীরা দেখেন যে, ফ্যাসিবাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া ‘ছোট ফ্যাসিস্টরা’ আজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে ক্ষমতার রস আস্বাদন করছে, তখন তাদের মনোবেদনার গভীরতা মাপা অসম্ভব। অপরাধী চক্রের একজন শীর্ষ নেতার গ্রেপ্তারের সাময়িক আনন্দধারা দিয়ে এই বঞ্চিত ভাই-বোনদের ভেতরের অন্তর্দহন এবং কষ্টের আগুন কখনো মুছে ফেলা যাবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধি অভিযানের আবশ্যকতাঃ
ফ্যাসিবাদের পতন মানে কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং ফ্যাসিবাদী মানসিকতা, আমলাতান্ত্রিক অপরাধী সিন্ডিকেট (Bureaucratic Criminal Syndicate) ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আমূল উৎপাটন।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল জায়গা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে এই সব বিষাক্ত উপাদান, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ অনুপ্রবেশকারী ও ‘ইনসাইডার থ্রেট’ থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে। দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব ও তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের আবেগকে মর্যাদা দিয়ে এই ‘ছোট বেনজীরদের’ চিহ্নিত করে এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। অন্যথায়, যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে, সেই ঐতিহাসিক অর্জন এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা—দুই-ই এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পতিত হতে পারে।
লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।