আমরা কেন আল্লাহকে দেখতে পাই না: ইসলাম কী বলে?

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ৬:৩৮ অপরাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৮:১৭ অপরাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬


মানুষের মনে যুগে যুগে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে—যদি আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করে থাকেন, তবে আমরা তাঁকে দেখতে পাই না কেন? এই প্রশ্ন শুধু সাধারণ মানুষের নয়, বরং ইতিহাসে নবী-রাসুলদের যুগ থেকেও বিভিন্ন মানুষ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। ইসলাম এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা প্রদান করেছে।

আল্লাহ দৃশ্যমান জগতের সৃষ্টিকর্তা

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো, আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা। তিনি সময়, স্থান ও বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। আমরা যে চোখ দিয়ে দেখি, তা মূলত সৃষ্ট বস্তু, আলো এবং নির্দিষ্ট আকৃতির জিনিস দেখার জন্য উপযোগী। কিন্তু আল্লাহ কোনো সৃষ্ট বস্তু নন, তাঁর কোনো আকৃতি বা সীমাবদ্ধ রূপ নেই। তাই মানুষের পার্থিব চোখ দ্বারা আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

“দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ত করেন।” (সূরা আল-আনআম: ১০৩)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা সীমাহীন।

হযরত মূসা (আ.)-এর ঘটনা

আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে নতুন নয়। কুরআনে উল্লেখ আছে, হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে তাঁকে দেখার আবেদন করেছিলেন। তখন আল্লাহ বলেন, “তুমি আমাকে দেখতে পারবে না।” এরপর আল্লাহ একটি পাহাড়ের দিকে তাঁর নূরের সামান্য প্রকাশ ঘটালে পাহাড়টি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং মূসা (আ.) অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুনিয়ার কোনো সৃষ্টি আল্লাহর মহিমা ও নূরের পূর্ণ প্রকাশ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না।

দুনিয়া হলো পরীক্ষা, প্রত্যক্ষ দর্শনের স্থান নয়

ইসলাম অনুযায়ী পৃথিবীর জীবন একটি পরীক্ষা। মানুষকে বিশ্বাস, বিবেক, চিন্তাশক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহকে মেনে নিতে হয়। যদি সবাই আল্লাহকে সরাসরি দেখতে পেত, তাহলে ঈমান আনার পরীক্ষার অর্থ অনেকাংশে হারিয়ে যেত।

যেমন আমরা বাতাস দেখতে পাই না, কিন্তু তার অস্তিত্ব অনুভব করি; তেমনি আল্লাহকে চোখে না দেখলেও তাঁর সৃষ্টি, নিয়ম-কানুন এবং অসংখ্য নিদর্শনের মাধ্যমে তাঁর অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারি।

জান্নাতে মুমিনদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার

ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, দুনিয়ায় আল্লাহকে দেখা সম্ভব না হলেও আখিরাতে জান্নাতবাসী মুমিনদের জন্য আল্লাহকে দর্শন করার সৌভাগ্য হবে। এটি হবে জান্নাতের সবচেয়ে বড় নিয়ামত ও আনন্দ।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জান্নাতবাসীরা তাদের প্রতিপালককে এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমন তারা পূর্ণিমার চাঁদকে স্পষ্টভাবে দেখে।

অর্থাৎ, আল্লাহকে না দেখতে পাওয়া কোনো বঞ্চনা নয়; বরং এটি দুনিয়ার জীবনের একটি বাস্তবতা, আর তাঁর দর্শন হবে পরকালের বিশেষ পুরস্কার।

যুক্তির আলোকে বিষয়টি

মানুষের জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা মহাবিশ্বের অসংখ্য বিষয় আজও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। এমনকি আত্মা, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা অনেক প্রাকৃতিক শক্তিকেও আমরা সরাসরি দেখি না, বরং তাদের প্রভাব দেখি। সুতরাং শুধুমাত্র চোখে দেখা যায় না বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব অস্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

আল্লাহকে দেখা যায় না, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির নিখুঁত বিন্যাস, প্রকৃতির বিস্ময়কর নিয়ম, মানবদেহের জটিলতা এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা তাঁর অস্তিত্ব ও ক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে।


“আমরা কেন আল্লাহকে দেখতে পাই না?”—এর উত্তর ইসলামে অত্যন্ত স্পষ্ট। আল্লাহ মানুষের দৃষ্টিশক্তির সীমার বাইরে, কারণ তিনি সৃষ্টির মতো নন এবং তাঁর মহিমা দুনিয়ার কোনো সৃষ্টির পক্ষে ধারণ করা সম্ভব নয়। পৃথিবী বিশ্বাস ও পরীক্ষার স্থান, আর আখিরাত হলো পুরস্কারের স্থান। তাই একজন মুমিন আল্লাহকে চোখে না দেখেও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং সেই মহিমান্বিত দিনের অপেক্ষায় থাকে, যেদিন জান্নাতে আল্লাহর দর্শন লাভ হবে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে।

আল্লাহকে দেখা না গেলেও তাঁর অসংখ্য নিদর্শন আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে; আর সেই নিদর্শনগুলোই মানুষকে তাঁর পরিচয় ও মহত্বের দিকে আহ্বান জানায়।


সম্পাদনায় শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল 

সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক