সরকারের ১০০ দিনে ‘কিছু’ উদ্যোগ ইতিবাচক, সুশাসন নিয়ে ‘উদ্বেগ’ টিআইবির

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ৪:৪৪ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৬:৩৯ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬

নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

রোববার (৭ জুন) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ একটি জবাবদিহিমূলক, সুশাসিত ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া সরকার সংস্কার ও দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার করলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, সরকারের কিছু পদক্ষেপ নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


টিআইবির মতে, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এসব সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি এখনো সীমিত।

তবে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার, মন্ত্রীদের কর্মমূল্যায়নের ঘোষণা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নজরদারি বৃদ্ধির উদ্যোগ। টিআইবির ভাষ্য, এসব পদক্ষেপ সরকারের সদিচ্ছার ইঙ্গিত বহন করে।

একই সঙ্গে সংস্থাটি বলছে, সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত এবং উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বক্তব্য নির্বাচনী ইশতেহার ও রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত কিছু আইন বাতিল বা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নতুন নেতৃত্ব নিয়োগে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণ হতে পারে।

ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ে ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের মনোভাবেরও সমালোচনা করেছে টিআইবি। পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগকে নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সংস্থাটি বলেছে, সরকারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পরও চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাই এবং বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তারের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর হামলার ঘটনাগুলো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সার্বিক মূল্যায়নে টিআইবি বলেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে যেমন সম্ভাবনা ও ইতিবাচকতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তেমনি সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ঘাটতিও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।