সংস্কারের অভিযাত্রা বনাম বাস্তবতার কষ্টিপাথর: সরকারের প্রথম ৯০ দিনের খতিয়ান-- প্রফেসর ড.আসিফ মিজান
- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ও ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন জনাব তারেক রহমান এমপি। একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক রূপান্তর, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং অবিন্যস্ত প্রশাসনিক কাঠামোর পটভূমিতে দায়িত্ব নিয়ে আজ ১৭ মে ২০২৬ তারিখে এই নতুন সরকার তার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম ৯০ দিন বা ৩ মাস পূর্ণ করল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং 'হানিমুন পিরিয়ড' (Honeymoon Period)-এর সমকালীন প্রক্ষাপট থেকে বিচার করলে, ৯০ দিন একটি নির্বাচিত সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়। তবে এই প্রাথমিক সময়কালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এর মাধ্যমেই একটি নতুন সরকারের নীতিগত দর্শন, সংস্কারের সদিচ্ছা এবং ভবিষ্যৎ অভিযাত্রার গতিপথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ৩ মাসে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কল্যাণমুখী উদ্যোগ যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনস্বাস্থ্য সংকট নিয়ে বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা-সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে।
১. জনমুখী প্রতীকী নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির রূপান্তর
নতুন সরকারের প্রথম ৯০ দিনের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং মনমাতানো দিকটি ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং এক ধরনের 'প্রটোকলহীন জনবান্ধব' সংস্কৃতির প্রবর্তন। বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ এবং বিশাল নিরাপত্তা প্রোটোকলের যে প্রথা তৈরি হয়েছিল, তা পরিহার করে সাধারণ মানুষের মতো যানজটে চলাচল করা, পায়ে হেঁটে সচিবালয়ে যাওয়া কিংবা সাধারণ গ্যালারিতে বসে ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করার মতো আচরণগুলো নাগরিক সমাজে গভীর ও ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে। এটি মূলত রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি আধুনিক পপুলিস্ট (Populist) কৌশল, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
এর পাশাপাশি, প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতা ও ফাইল জট কাটাতে প্রথা ভেঙে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারেও নিয়মিত অফিস করার যে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন, তা আমলাতন্ত্রের অভ্যন্তরে এক ধরনের তৎপরতা ও গতিশীলতা তৈরি করেছে। কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি এই ধরনের আচরণগত সংস্কার (Behavioral Reform) সুশাসনের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
২. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামষ্টিক অর্জনের চালচিত্র
বিগত ১৭ বছরের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক অনিয়ম ও তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। প্রথম ৯০ দিনে এই খাতে সরকারের কিছু নীতিগত অগ্রগতি লক্ষ্যণীয়:
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সুশাসন:
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে কঠোর অবস্থান এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ (BPM-6) পদ্ধতি অনুসরণ করে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ প্রায় "৩৫.৬২ বিলিয়ন ডলারে" উন্নীত করতে পারা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির সংবাদ। এটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
কৃষি ও প্রান্তিক অর্থনীতির সুরক্ষা:
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের বকেয়া কৃষি ঋণ (১০ হাজার টাকা পর্যন্ত) মওকুফের সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। একই সাথে 'কৃষক কার্ড' বিতরণ ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে 'খোর্দ্দ খাল পুনঃখনন' ও জলাশয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রামীণ উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net):
নিম্নআয়ের মানুষদের মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে রক্ষা করতে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকার নিত্যপণ্য সহায়তার 'ফ্যামিলি কার্ড' এবং টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের এক ধরনের 'ওয়েলফেয়ার স্টেট' (Welfare State) বা কল্যাণমুখী ইমেজের জন্ম দিয়েছে।
*আইনশৃঙ্খলা ও ক্র্যাকডাউন:
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সড়ক, মহাসড়ক ও বাজার থেকে দীর্ঘদিনের কায়েমি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ভাঙতে দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর কঠোর অভিযান ও পুলিশিং সংস্কার সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের সাময়িক স্বস্তি এনেছে।
৩. বাস্তবতার কষ্টিপাথর: নীতিগত চ্যালেঞ্জ, জনস্বাস্থ্য ও সমালোচনা
জনপ্রিয়তা এবং মনমাতানো অর্জনের সমান্তরালে গত ৯০ দিনে সরকারকে কিছু গভীর সংকটেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা সুশীল সমাজ এবং টকশোগুলোতে বিদগ্ধ আলোচকদের দ্বারা সমালোচিত হচ্ছে। এই সমালোচনাগুলোকে সরকারের ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য 'সতর্কবার্তা' হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
জনস্বাস্থ্য সংকট ও নীতিগত সমন্বয়হীনতা:
এই ৯০ দিনের মধ্যে সরকারের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ছিল দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব এবং এর ফলে চার শতাধিক শিশুর অকাল মৃত্যু। যদিও এজন্য প্রফেসর ড. ইউনূস সরকারের অবহেলাই দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন।এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ধীরগতির টিকাদান কর্মসূচি এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়েছে, যা নিয়ে বিরোধী দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) তীব্র সমালোচনা করেছে। এটি স্পষ্ট করে যে, দৃশ্যমান চমকের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা কতটা জরুরি।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও প্রশাসনিক বিতর্ক: দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় (২৫ ফেব্রুয়ারি) ব্যাংক কর্মকর্তাদের একাংশের প্রতিবাদের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক নজির সৃষ্টি করেছে।
মূল্যস্ফীতি ও পিআর-নির্ভরতার অভিযোগ:
চাল, ডাল ও তেলের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো সত্ত্বেও অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সাধারণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো পুরোপুরি নিম্নবিত্তের নাগালের মধ্যে আসেনি। ফলে মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকির অভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে। এই কারণেই জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক অভিযোগ তুলেছেন যে, সরকার কাঠামোগত দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘পাবলিক রিলেশনস’ (PR) বা ইমেজের প্রচারণাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
পররাষ্ট্র নীতির প্রথম পরীক্ষা:
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের পর উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের পক্ষে এবং ইরানের পাল্টা আঘাতের বিরুদ্ধে সরকারের আনুষ্ঠানিক ও একপেশে নিন্দা জ্ঞাপনকে দেশের একটি বড় অংশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা ‘ভারসাম্যহীন’ পররাষ্ট্র নীতি হিসেবে দেখছেন। বহুমাত্রিক কূটনৈতিক বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তবে আমার মতো অনেকেই আবার সরকারের অবস্থানকে অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে মনের করেন।
ভবিষ্যৎ উত্তরণের পথ
একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল ব্যবস্থার পর ক্ষমতা গ্রহণ করে মাত্র ৯০ দিনে জাদুর কাঠির মতো সব সংকটের সমাধান কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার তার প্রথম ৩ মাসে একাধারে জনমুখী সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক সংস্কারের আভাস এবং সাহসী কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের একটি বড় অংশের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছেন।
তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে, "চমক বা পপুলিজম" দিয়ে সাময়িক প্রশংসা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও কাঠামোগত রূপান্তর। ১০০ দিনের মাইলফলক এবং তার পরবর্তী সময়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে সরকারের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন রক্ষা:
বাংলাদেশ ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি স্বায়ত্তশাসিত ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাময়িক রাজনৈতিক চাপমুক্ত রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদার উপায়ে কাজ করতে দেওয়া সমীচীন হবে।
২. বাজার ও স্বাস্থ্য খাতে কঠোরতা:
কেবল শুল্ক হ্রাস নয়, মাঠ পর্যায়ে মূল্য তালিকা কার্যকর করতে কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি হাম ও ডেঙ্গুর মতো আসন্ন গ্রীষ্মকালীন স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় আপৎকালীন টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
৩. নীতি নির্ধারণে গভীরতা:
যেকোনো বড় প্রশাসনিক রদবদল বা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আরও নিবিড় হোমওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন, যাতে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বা "ইউ-টার্ন" নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
প্রথম ৯০ দিনে সরকারের সংস্কারমুখী মনোভাব ও সদিচ্ছা প্রশংসনীয়। তবে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার পারদ যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে আগামী দিনগুলোতে স্বচ্ছতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং বাস্তব দক্ষতা প্রদর্শনের পরীক্ষা আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হবে।