ক্ষমতার বসন্তে নিঃস্ব তৃণমূল: বিএনপির মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান।

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১২:৪১ অপরাহ্ন, ০৬ মে ২০২৬ | আপডেট: ৫:১৭ অপরাহ্ন, ০৭ মে ২০২৬


দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারবিরোধী অগ্নিপরীক্ষা এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার মহিমান্বিত অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জননেতা তারেক রহমান এমপি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি রাজনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত শিখর মনে হলেও, ক্ষমতার এই মধুচন্দ্রিমার আড়ালে দলের মূল চালিকাশক্তি- তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি বিশাল অংশ আজ এক গভীর ও প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক সংকটে (Psychological Crisis) নিমজ্জিত। রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের দল আসীন থাকলেও রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিকদের যাপিত জীবনের ক্লেশ কমেনি; বরং দলের ভেতরে হঠাৎ জেঁকে বসা ‘সুযোগসন্ধানী’ ও ‘হাইব্রিড’ চক্রের দাপটে তারা আজ নিজ ঘরেই পরবাসী।


বঞ্চনার সমীকরণ ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট


রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বের তাত্ত্বিক টেড রবার্ট গার (Ted Robert Gurr)-এর ‘আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ’ (Relative Deprivation) তত্ত্বের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। যখন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান আকাশচুম্বী হয়, তখনই জনমানসে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। বিগত ১৫ বছর যারা বিচারিক হয়রানি, কারাবরণ এবং পদ্ধতিগত নিপীড়নে নিঃস্ব হয়েছেন, আজ ক্ষমতার সুফল যখন তাদের পরিবর্তে ‘বসন্তের কোকিল’ বা সুবিধাভোগীদের হাতে পুঞ্জীভূত হতে দেখছেন, তখন সেই ক্ষোভ বঞ্চনা থেকে বিদ্রোহের দিকে মোড় নিতে পারে। পিয়েরে বোর্দিউ (Pierre Bourdieu)-এর পুঁজি তত্ত্বের ভাষায়, ত্যাগী কর্মীদের ‘রাজনৈতিক পুঁজি’ আজ কিছু নেতার ‘আর্থিক পুঁজি’র কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই কাঠামোগত বৈষম্য দলের অভ্যন্তরে এক নতুন ধরনের ‘রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্র’ (Political Elitism) তৈরি করছে, যা তৃণমূলের ত্যাগকে অবমূল্যায়ন করার নামান্তর।


অনুপ্রবেশের রাজনীতি: একটি আদর্শিক বিচ্যুতি


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এমপি অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে বারবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার (Institutional Weakness) বেড়াজালে আটকা। অভিযোগ উঠছে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর এবং স্থানীয় দলীয় কাঠামোতে এখনো ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসর কিংবা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় পুনর্বাসিত হচ্ছে। একে রাজপথের কর্মীরা কেবল সাংগঠনিক ত্রুটি নয়, বরং ‘আদর্শিক বেইমানি’ (Ideological Betrayal) হিসেবে দেখছেন। ২০২৫ এবং ২০২৬-এর প্রথমার্ধে ঘটে যাওয়া অভ্যন্তরীণ কোন্দলগুলো মূলত কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং এটি হলো দলের স্বচ্ছতা রক্ষা এবং হাইব্রিডদের দখদারিত্বের বিরুদ্ধে তৃণমূলের এক অলিখিত যুদ্ধ।


টেকসই শাসনের লক্ষ্যে চার দফা সাংগঠনিক প্রস্তাবনা


আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় সুসংহত করতে এবং বিএনপিকে একটি জনমুখী ও গতিশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে  ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিম্নলিখিত সংস্কারগুলো এখন সময়ের দাবি:


১. কঠোর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান (Internal Purge):


ক্ষমতার দাপটে যারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দখলদারিত্বে লিপ্ত হয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে, তাদের জন্য ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। একটি বিশেষ ‘ইনভেস্টিগেশন সেল’ গঠন করে বিতর্কিতদের দল থেকে স্থায়ীভাবে ছাঁটাই করতে হবে।


২. আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন: 


পকেট কমিটি বা আত্মীয়প্রীতির সংস্কৃতি চিরতরে বিদায় করতে হবে। প্রতিটি ইউনিটে সরাসরি ভোট বা স্বচ্ছ পারফরম্যান্স রিভিউয়ের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। ত্যাগী কর্মীদের মেধার ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও দলের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ত করা এখন অপরিহার্য।


৩. জাতীয় বীরদের পুনর্বাসন ও কল্যাণ তহবিল:


বিগত দেড় দশকে যারা গুম-খুন হয়েছেন কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের পরিবারের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় ও দলীয় ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ নিশ্চিত করা নৈতিক দায়বদ্ধতা। কর্মীদের কেবল ভোটের মেশিন হিসেবে নয়, বরং অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।


৪. ড্রয়িংরুম রাজনীতির অবসান ও জনসম্পৃক্ততা:


 কেন্দ্রীয় নেতাদের ‘এসিমুখী’ রাজনীতি ছেড়ে শেকড়ে ফিরতে হবে। তৃণমূলের অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য একটি স্থায়ী ‘টু-ওয়ে কমিউনিকেশন’ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে, যাতে মাঠের প্রকৃত চিত্র শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাতে কোনো বাধা না থাকে।


ইতিহাসের নির্দয় পাঠ হলো- যে দল তার দুর্দিনের কাণ্ডারিদের অবমূল্যায়ন করে, ক্ষমতার উত্তাপে সেই দলের ভিত্তি দ্রুত শিথিল হয়ে যায়। বিএনপি আজ ক্ষমতায়, কিন্তু এই ক্ষমতার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত আস্থার ওপর। হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে মাঠের প্রকৃত যোদ্ধাদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া না হলে, এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একদিন বড় ধরনের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে পকেট কমিটি নয়, বরং রাজপথের লড়াকু কর্মীদের নেতৃত্বই হতে পারে বিএনপির প্রকৃত ‘কোর স্ট্রেংথ’। মনে রাখতে হবে, তৃণমূলের তুষ্টিই হলো দীর্ঘমেয়াদী সুশাসনের চাবিকাঠি।


লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

রাজনীতি বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ এবং ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সেমালিয়া।