পুলিশের ইউনিফর্ম সংস্কার: জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্বের সমন্বয় - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রথম ধাপ হলো তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনবান্ধব এবং পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এই সংস্কারের একটি দৃশ্যমান অংশ হলো ইউনিফর্ম পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তন যেন কেবল বাহ্যিক না হয়ে একটি গভীর এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ
পুলিশের ইউনিফর্ম কেমন হবে, তা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ফাইলবন্দি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যারা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনরাত রাস্তায় দায়িত্ব পালন করেন, সেই মাঠপর্যায়ের সদস্যদের স্বাচ্ছন্দ্য ও মতামতের প্রতিফলন এখানে থাকা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে একটি 'গুগল ফর্ম' বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেক সদস্যের মতামত নেওয়া সম্ভব। এতে ইউনিফর্মের কাপড়, রং এবং কার্যকারিতা নিয়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যাবে।
সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার
আমরা দেখেছি, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে অপরিকল্পিতভাবে কয়েক দফায় পুলিশের পোশাক ও লোগো পরিবর্তন করা হয়েছে, যার নেপথ্যে ছিল শত শত কোটি টাকার সিন্ডিকেট বাণিজ্য। জনগণের ট্যাক্সের এই বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় আর দেখতে চায় না এদেশের মানুষ। নির্বাচিত ও দায়বদ্ধ সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—পোশাকের গুণমান ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক, যা সাশ্রয়ী এবং স্বচ্ছ।
পোশাক ও আস্থার সংকট
ইউনিফর্ম কেবল একটি পোশাক নয়, এটি একটি বাহিনীর পরিচয় ও মনস্তাত্ত্বিক আস্থার প্রতীক। পুলিশের নতুন পোশাক যেন হয় তাদের কর্মপরিবেশের উপযোগী এবং সাধারণ মানুষের কাছে ভীতিমুক্ত ও আস্থাশীল। সংস্কারের নামে লোকদেখানো পরিবর্তন নয়, বরং বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
সুপারিশমালা:
ডিজিটাল জরিপ: অবিলম্বে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পছন্দ-অপছন্দ যাচাইয়ে অনলাইন মতামত গ্রহণ করা।
প্রফেশনাল ডিজাইন: বিশেষজ্ঞ ফ্যাশন ডিজাইনার এবং বাহিনীর অভিজ্ঞ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও মার্জিত নকশা চূড়ান্ত করা।
স্বচ্ছ টেন্ডার: ইউনিফর্মের কাপড় কেনা থেকে শুরু করে সেলাই পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
আমরা আশা করি, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় এই যৌক্তিক দাবিটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন। পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাহিনীর ভেতরে যেমন আত্মসম্মান বাড়বে, তেমনি জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সুশাসনের নজির স্থাপিত হবে।
লেখকঃ ভিসি, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া।