মূল্যবোধের অবক্ষয় ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?---অধ্যাপক ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
জীবননদীর বাঁকে এসে চল্লিশের কোঠা পার হওয়ার পর পরিচিত পরিমণ্ডলের প্রায় সবাই যেন এক সমান্তরালে চলে আসেন। বয়সের ব্যবধান ঘুচে গিয়ে অনেকেই হয়ে ওঠেন সহকর্মী কিংবা বন্ধু। এটি জীবনের এক চিরায়ত নিয়ম। কিন্তু এই বন্ধুত্বের আবহেও বয়স ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম অথচ ইতিবাচক মর্যাদাপূর্ণ দূরত্ব কিন্তু সারাজীবনই বজায় থাকে। বিশেষ করে শিক্ষক এবং অগ্রজদের ক্ষেত্রে এই দূরত্বের ভেতর লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত সুন্দর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার রসায়ন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি আজও আমার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে দাঁড়িয়ে রেখে নিজে আরাম করে বসার কথা কল্পনাও করতে পারি না। আর তিনি যদি হন আমার সরাসরি শিক্ষক, তবে সেই সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ আমার কাছে সবসময়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। এটি কোনো লোকদেখানো লৌকিকতা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক শাশ্বত মূল্যবোধ।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু অম্লমধুর স্মৃতি আজও মনের মণিকোঠায় ভাস্বর। ছাত্রজীবনে একজন শিক্ষক হয়তো আমাকে প্রাপ্য নম্বরের চেয়ে কিছুটা কম দিয়েছিলেন। অন্য একজন শ্রদ্ধেয় পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে আমার নম্বর কমিয়ে দেওয়ার মানসে মাস্টার্সের একটি কোর্সে তৃতীয় পরীক্ষক বা 'থার্ড এক্সামিনার' হিসেবে এমন একজন জুনিয়র শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যিনি সাধারণত মাস্টার্স পর্যায়ে পাঠদানের সুযোগই পান না। সময়ের ব্যবধানে সেই ক্ষোভ বা না পাওয়ার বেদনা আজ কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। এত কিছুর পরও আমি সেই শিক্ষকদের আজও আগের মতোই অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা করি এবং আজীবন পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করে যাব, ইনশাআল্লাহ। কারণ তাঁদের শাসন কিংবা অবিচার যা-ই হোক না কেন, তাঁদের ছায়াতলেই আমার আজকের এই অস্তিত্ব।
অথচ বড় বেদনার সাথে আজ লক্ষ্য করতে হয়, বর্তমান প্রজন্মের এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিষ্টাচারবর্জিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। শিক্ষকের মুখের ওপর অবলীলায় তর্ক করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষককে নিয়ে কটূক্তি করা কিংবা তুচ্ছ কারণে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার মতো ঘটনা আজ আর আমাদের বিস্মিত করে না, বরং ব্যথিত ও শঙ্কিত করে। এই মূল্যবোধহীন তথাকথিত শিক্ষার্থীদের দিয়ে আমরা আসলে জাতির কেমন ভবিষ্যৎ আশা করতে পারি? শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় কি প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়?
শিক্ষা কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়, শিক্ষা হলো মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতা বিকাশের সোপান। আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের মেধার পাশাপাশি শিষ্টাচার ও গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষায় দীক্ষিত করি। তবেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সুন্দর ও প্রগতিশীল মানবিক সমাজ।
লেখকঃ ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া।