অবক্ষয়ের অতলান্তে নাগরিক জীবনঃ সামাজিক সংবেদনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা– প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কোনো রাষ্ট্রের করুণা বা অনুগ্রহ নয়—এগুলো মানবসত্তার জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (UDHR) ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিটি মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ঘটে চলা একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, মব জাস্টিস (Mob Justice), ছিনতাই, চাঁদাবাজি, পারিবারিক সহিংসতা এবং তরুণ প্রজন্মের আত্মহত্যার মিছিল প্রমাণ করছে—এ দেশে মানুষের জীবন ও সম্পদের মৌলিক নিরাপত্তা আজ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত।
এই সংকটটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সাময়িক পতন নয়; এটি একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক নৈতিকতা, পারিবারিক অনুশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের সামগ্রিক দেউলিয়াত্বের এক করুণ প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি ও অবক্ষয়ের চিত্রচিত্র
নিকট অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চুরির অপবাদে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা, খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সিফাত মারুফকে নৃশংস আক্রমণ ও হত্যা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শামসুজ্জামান কিংবা বুয়েটে আবরার ফাহাদের মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সহিংস সংস্কৃতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিং, পারস্পরিক ট্রলিং এবং বিষাক্ত সম্পর্কের জেরে একের পর এক উদীয়মান তরুণের আত্মহত্যার ঘটনা প্রকাশ করছে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ভঙ্গুরতা। ঘটনার স্থান, পাত্র ও প্রেক্ষাপট আলাদা হতে পারে; কিন্তু এর অন্তর্দাহ এক ও অভিন্ন—মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞা, সহিংসতাকে স্বাভাবিক বা 'নরম্যালাইজ' করার ব্যাধি এবং অপরাধ সংঘটনের পর পার পেয়ে যাওয়ার এক বিপজ্জনক সামাজিক ও আইনি সংস্কৃতি।
ধর্মীয় ও নৈতিকতার মৌলিক ঘোষণা
পবিত্র কোরআনে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, “অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য; আর একজনের জীবন রক্ষা করা যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষার অনুরূপ” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২)। একইভাবে জননিরাপত্তা বিনষ্ট করা, চুরি, লুণ্ঠন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩৩ ও ৩৮) রাখা হয়েছে প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং সমাজে শান্তি, সম্মান ও জীবনের আমানত নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে।
মানবাধিকারের আধুনিক ভাষা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং আবহমান মানবসভ্যতার রীতিনীতি—সবগুলোই একবিন্দুতে মিলিত হয়: মানুষকে হত্যা, নির্যাতন বা তার অধিকার লুণ্ঠন করা সভ্যতার বিরুদ্ধে এক গুরুতর অপরাধ।
কিন্তু আজ যখন দর্শকেরা অপরাধের দৃশ্য দেখে সেলফি বা ভিডিও তোলে, রক্তারক্তি ভিডিও ফেসবুক বা টিকটকে বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়, এবং বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়ে—তখন বুঝতে হবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি পচনশীল সামাজ কাঠামোর চরম নৈতিক অবক্ষয়।
তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: অপরাধবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে
১. 'ব্রোকেন উইন্ডোজ থিওরি' ও সামাজিক নীরবতা
অপরাধবিজ্ঞানের বিখ্যাত 'ব্রোকেন উইন্ডোজ থিওরি' (Broken Windows Theory) অনুসারে, ছোটখাটো অপরাধ বা অন্যায়কে যখন সমাজ বা রাষ্ট্র প্রশ্রয় দেয়, তখন তা বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনে অপরাধীদের উৎসাহিত করে। আমাদের সমাজে আজ মব ভায়োলেন্স বা ‘জনতার বিচার’ নামে যা ঘটছে, তা মূলত ছোট ছোট বেআইনি আচরণকে ক্ষমা বা সামাজিক ছাড় দেওয়ারই ফল।
জার্মান চিন্তাবিদ হান্না আরেন্ট (Hannah Arendt) তাঁর বিখ্যাত 'Banalization of Evil' ধারণায় ব্যাখ্যা করেছিলেন—ভয়াবহ অপরাধ সবসময় কোনো দানবীয় সত্তা করে না; বরং সাধারণ মানুষের দায়িত্বহীনতা, চিন্তাহীনতা এবং নীরব অনুগত্য ও সহনশীলতার মধ্য দিয়েই অপরাধ সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে। আমাদের সামাজিক নীরবতা আজ অপরাধকে এক ধরণের 'সামাজিক বৈধতা' দিচ্ছে।
২. ভেবারীয় রাষ্ট্র ও 'চেইন অব কমান্ড'-এর বিপর্যয়
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার (Max Weber) আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন—সহিংসতার বৈধ একচ্ছত্র অধিকার (Monopoly of the legitimate use of physical force) এবং নিয়মভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো (Legal-Rational Authority)।
বাংলাদেশে গত দুই দশকে কেবল প্রতিষ্ঠানগুলোই দুর্বল হয়নি, বরং কার্যকারী প্রশাসনিক অনুশাসন বা Chain of Command সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা আবাসিক এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে প্রক্টরিয়াল বডি, হল প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে কোনো দ্রুত ও সমন্বিত সাড়াদান দেখা যায় না। দায়িত্ব ঠেলে দেওয়ার এই প্রবণতা যখন নিয়মভিত্তিক কর্তৃত্বকে পরাজিত করে, তখন আইনের প্রয়োগ স্তব্ধ হয় এবং নাগরিকে নিরাপত্তা আর 'অধিকার' থাকে না—তা 'ভাগ্যের ব্যাপার' হয়ে দাঁড়ায়।
৩. 'শো-আপ' সংস্কৃতি ও অ্যানোমি (Anomie)
সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুরখেইম (Émile Durkheim)-এর 'অ্যানোমি' বা নিয়মহীনতার তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার বাঁধন ভেঙে যায় এবং নতুন কোনো আদর্শ তৈরি হয় না, তখন সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে উদ্ভূত ‘শো-আপ’ (Show-off) সংস্কৃতি ও রিলস/টিকটক কেন্দ্রিক সস্তা জনপ্রিয়তার তাড়না মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও সংবেদনহীন করে তুলছে। ক্ষমতার দাপট দেখানো কিংবা সহিংসতার দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো—আজ এক বিকৃত আত্মপ্রদর্শনের রূপ নিয়েছে। এই সামাজিক দেউলিয়াত্ব তরুণ সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে গ্যাং-কালচার, মাদক ও সহিংসতার দিকে; অথবা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে বেছে নিতে বাধ্য করছে আত্মহত্যার মতো নির্মম পথ।
অসুস্থ প্রজন্মের দায় কার?
১. পরিবারের ভূমিকা ও ভুল সাফল্য-সংজ্ঞা
সন্তান জন্ম দেওয়াতেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মানুষের চরিত্র গড়ে ওঠে অভ্যাসের মাধ্যমে (Habitual Virtue)। শিশু প্রতিদিন পরিবারে যে আচরণ দেখে, তা-ই তার চরিত্র নির্মাণ করে।
আজ বহু পরিবারে সততা, সহানুভূতি ও সংযমের চেয়ে জিপিএ-৫, ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রদর্শনযোগ্য সাফল্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সন্তান বৈধ উপায়ে সফল হলো নাকি অবৈধ উপায়ে—তা নিয়ে ভাবার সময় অনেক অভিভাবকের নেই। "যে কোনো মূল্যে জিততে হবে"—এই প্রতিযোগী সংস্কৃতি সন্তানকে সমাজবিচ্ছিন্ন, স্বার্থপর ও অহংকারী বানিয়ে তুলছে।
২. শাস্তির নিশ্চয়তাহীনতা (Certainty of Punishment)
অপরাধবিজ্ঞানের জনক সিজার বেকারিয়া (Cesar Beccaria) প্রমাণ করেছিলেন—শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা (Certainty of Punishment) অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপরাধী যদি জানে যে—রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার হাত অথবা দীর্ঘসূত্র বিচার ব্যবস্থার ফাঁক গলে সে বেরিয়ে যেতে পারবে, তবে আইন তার কাছে কার্যকারিতা হারায়। এই ভয়হীনতাই প্রতিনিয়ত নতুন অপরাধী ও অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ: পঞ্চমুখী করণীয়
এই ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন:
আইনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ: প্রতিটি হত্যাকাণ্ড, মব জাস্টিস ও সহিংসতার নিরপেক্ষ, পেশাদার ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত বা বিচারে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বরদাশত করা যাবে না।
প্রতিষ্ঠান ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার: বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ও শক্তিশালী নিরাপত্তা অবকাঠামো, জরুরি রেসপন্স টিম, প্রক্টোরিয়াল মনিটরিং এবং সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মেলবন্ধন তৈরি করতে হবে।
পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ: পরিবারে সন্তানকে কেবল ‘বড় হওয়ার’ প্রতিযোগিতা না শিখিয়ে ‘মানুষ হওয়ার’ ও ‘সৎ থাকার’ শিক্ষা দিতে হবে। পরাজয় মেনে নেওয়া, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং রাগ সংবরণ করার চর্চা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে সহজলভ্য করতে হবে। বুলিং, সাইবার ট্রলিং, মাদকাসক্তি এবং একাকীত্বকে গুরুত্বের সাথে দেখে সংঘাত নিরসন ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের স্থায়ী সেল গঠন করতে হবে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা: অপরাধের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অপরাধীকে ‘নায়ক’ না বানিয়ে বা ঘটনার সেনসেশন তৈরি না করে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরতে হবে। ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা এবং গুজবের বিপরীতে সত্য তথ্য প্রচার নিশ্চিত করতে হবে।
অতএব, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল মেগা প্রজেক্ট, নতুন সড়ক, সুউচ্চ ভবন কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নির্ধারিত হয় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত মর্যাদা ও উন্নয়ন নিশ্চিত হয় তখন—যখন একজন সাধারণ নাগরিক রাতের অন্ধকারে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন; যখন একজন শিক্ষার্থী তার প্রিয় ক্যাম্পাসে জীবনের ঝুঁকি ছাড়া পড়ালেখা করতে পারেন; এবং যখন একটি শিশু জানে যে তার জীবন ও স্বপ্ন এই রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে অমূল্য।
অপরাধের বিচার না হলে আইন দুর্বল হয়; আইন দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে; প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়লে নাগরিকের আস্থা নষ্ট হয়; আর নাগরিকের আস্থা নষ্ট হলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিমূলই ধসে পড়ে।
সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রাথমিক দায় পরিবারের; সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার দায় সুশীল সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার; কিন্তু নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার চূড়ান্ত এবং সাংবিধানিক দায় রাষ্ট্রের। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই এবং যৌথ নৈতিক পুনর্জাগরণে অংশ না নিই, তবে এমন এক ভবিষ্যতের মুখোমুখি হব—যেখানে মানুষ হত্যা করতে ভয় পাবে না, হত্যার পর অনুতপ্ত হবে না, আর সমাজ কেবল নিরব দর্শক হয়ে তামাশা দেখবে। সেই সামাজিক বিপর্যয় রোধানোই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় কর্তব্য।
লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।