পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু: একজন সাংবাদিকের নীরব কান্না, গণমাধ্যমের গভীর ক্ষত---শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১২:২১ পূর্বাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:০২ পূর্বাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

চাকরি হারানো, আর্থিক অনটন ও পেশাগত অনিশ্চয়তার কাছে কি শেষ পর্যন্ত হার মানলেন একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক? পুলক চ্যাটার্জির মর্মান্তিক আত্মহত্যা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাংবাদিক সমাজে। একজন অভিজ্ঞ, পরিচিত ও দীর্ঘদিনের পেশাজীবী সাংবাদিকের এমন করুণ পরিণতি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তার রেখে যাওয়া চিরকুটে চাকরি হারানো, আর্থিক সংকট এবং পেশাগত অনিরাপত্তা থেকে সৃষ্ট মানসিক যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। চিরকুটে লেখা কথাগুলো সত্যতা ও প্রেক্ষাপটসহ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি রাখে। তবে একজন সাংবাদিকের শেষ মুহূর্তের সেই অসহায়ত্বের কথা সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে—একজন সংবাদকর্মী সারাজীবন অন্যের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করার পর নিজের কণ্ঠস্বরটি শোনানোর মতো জায়গা কি তিনি পেয়েছিলেন?

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু যেন গণমাধ্যমের চাকচিক্যময় পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

সাংবাদিকতা কি এখনো নিরাপদ পেশা?

সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ দিনের পর দিন কাজ করেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। চাকরি আছে—কিন্তু কতদিন থাকবে, তা জানা নেই। বেতন আছে—কিন্তু সময়মতো পাওয়া যাবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। বছরের পর বছর পেশায় থাকার পরও অনেক সাংবাদিকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

হঠাৎ চাকরি চলে গেলে একজন সাংবাদিক শুধু একটি চাকরি হারান না; অনেক সময় হারান পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও।

বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। বয়স, পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট—সবকিছু মিলিয়ে অনেকে চাকরি হারানোর পর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে—একজন সাংবাদিক চাকরি হারালে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো কার্যকর কাঠামো কি আমাদের আছে?

বেতন ও পাওনা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস

গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ নিয়মিত বেতন-ভাতা, চাকরির নিশ্চয়তা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ওয়েজ বোর্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো সাংবাদিক চাকরি হারালে তার বকেয়া বেতন, অন্যান্য পাওনা কিংবা ক্ষতিপূরণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

একজন সাংবাদিকের সংসারও অন্য দশটি পরিবারের মতো। তার বাড়িভাড়া আছে, সন্তানের পড়াশোনা আছে, চিকিৎসা ও নিত্যদিনের খরচ আছে। কিন্তু চাকরি হারানোর পর আয় বন্ধ হয়ে গেলে সেই পরিবারের ওপর যে চাপ তৈরি হয়, তা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

হাসিমুখে সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়ানো সাংবাদিকটির রাতের অন্ধকারে হয়তো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই আতঙ্ক থাকে।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেশে বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ নানা পেশাজীবী সংগঠন সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের নেতৃত্ব পেশাগত অধিকার আদায়ের চেয়ে দলীয় রাজনীতি, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা নিজেদের স্বার্থ নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

যদি একজন সাংবাদিক চাকরি হারানোর পর তার সংগঠন পাশে না দাঁড়ায়, পাওনা আদায়ে কার্যকর ভূমিকা না নেয় কিংবা সংকটের সময়ে তাকে একা ফেলে রাখে—তাহলে সেই সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সাংবাদিক সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়া নয়; এটি সাংবাদিকের বিপদের দিনে আশ্রয় হওয়ার কথা।

মালিকানা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ

গণমাধ্যম শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। কিন্তু গণমাধ্যমের মালিকানা যখন অতিরিক্তভাবে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা ও চাকরির নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

একদিকে সাংবাদিককে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে হয়, অন্যদিকে চাকরি টিকিয়ে রাখার চাপ থাকে। এই দ্বন্দ্ব একজন সংবাদকর্মীর মানসিক অবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

পুলকের মৃত্যু থেকে আমাদের শিক্ষা কী?

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে হয়তো আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাব।

তার মৃত্যু যদি সত্যিই চাকরি হারানো, আর্থিক সংকট ও পেশাগত অনিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি তদন্ত করে দেখা জরুরি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় তার দায় নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে দেখতে হবে—একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক কীভাবে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছালেন, যেখানে তার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না বলে তিনি মনে করলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলকের পরিবারের জন্য নয়; বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এখনই কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর আবেগ প্রকাশ করে কয়েক দিন পর বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।

প্রথমত, সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন। বিনা কারণে চাকরিচ্যুতি বন্ধ এবং চাকরি হারালে ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বেতন-ভাতা নিয়মিত ও সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য আটকে রেখে কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীল গণমাধ্যম হিসেবে দাবি করতে পারে না।

তৃতীয়ত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব হতে হবে সাধারণ সাংবাদিকের অধিকার রক্ষা।

চতুর্থত, চাকরিচ্যুতি, বকেয়া বেতন, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি কিংবা পেশাগত চাপের অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, সাংবাদিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং সংকটকালীন সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রতিদিন নানা ধরনের চাপ, হুমকি, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেন সংবাদকর্মীরা।

আর কোনো পুলক নয়

পুলক চ্যাটার্জি হয়তো আজ আর কোনো সংবাদ লিখবেন না। কোনো প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করবেন না। কোনো সংবাদকক্ষে বসে পরবর্তী দিনের খবর নিয়ে পরিকল্পনা করবেন না।

কিন্তু তার মৃত্যু একটি প্রশ্ন রেখে গেছে—

একজন সাংবাদিক যখন সারাজীবন মানুষের দুঃখ, অন্যায় ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন, তখন তার নিজের দুঃখের কথা শোনার মানুষ কোথায়?

পুলকের মৃত্যু যেন শুধু একটি পরিবারের কান্না হয়ে না থাকে। এটি হোক আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন, রাষ্ট্র এবং পুরো সাংবাদিক সমাজ—সবারই ভাবতে হবে।

কারণ একটি সংবাদকক্ষ তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়, যখন সেখানে সংবাদকর্মীর কলমের পাশাপাশি তার জীবন ও মর্যাদারও মূল্য থাকে।

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীর বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

আর কোনো সাংবাদিক যেন চাকরি হারিয়ে, আর্থিক অনটনে, পেশাগত অনিশ্চয়তায় কিংবা একাকী মানসিক যন্ত্রণায় এমন চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে না যান—এটাই হোক পুলক চ্যাটার্জির প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায় ও শ্রদ্ধা।