আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ, স্বামী-সন্তান হারিয়ে বিচারের অপেক্ষায় রুমা

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ন, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৫:০৬ অপরাহ্ন, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিজস্ব প্রতিবেদক:

জুলাই আন্দোলনে স্বামীকে হারিয়েছেন রুমা বেগম। স্বামী হত্যার বিচার পেতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার পর তার মেয়েকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার করার অভিযোগ উঠেছে। পরে মানসিক ট্রমা ও সামাজিক অপমানের কারণে মেয়েটি আত্মহত্যা করে বলে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে দাবি করেছেন রুমা।

স্বামী ও সন্তান হারিয়ে এখন বিচারের আশায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের পরিবারের ওপর নেমে আসা নির্মমতার বর্ণনা দেন রুমা বেগম।

জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নয়জন নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ফজলে নূর তাপস ও সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রুমা জানান, তার স্বামী জসিম উদ্দিন মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ‘পদক্ষেপ’ এনজিওতে চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে ধাওয়া খেয়ে বাসায় ফিরে আসেন তিনি। পরদিন জুমার নামাজের কথা বলে আবার বাসা থেকে বের হন।

রুমার ভাষ্য, ওইদিন সন্ধ্যার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানান, জসিম গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছেন। খবর পেয়ে তিনি চাচা শ্বশুর সালাম গাজীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান।

হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান রুমা। তখনও জসিমের জ্ঞান ছিল। তিনি জানান, গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে গেছে এবং বুকে গুলি লেগেছে। রুমার দাবি, জসিম তাকে জানিয়েছিলেন, জুমার নামাজের পর মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি আহত হন।

অসংখ্য গুলিবিদ্ধ মানুষ হাসপাতালে আসায় চিকিৎসক ও নার্সরা তখন হিমশিম খাচ্ছিলেন বলে জানান রুমা। রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে জসিমের অস্ত্রোপচার শেষ হয়। কিন্তু তার শরীর থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। পরে তার দুটি আঙুল কেটে ফেলা হয় এবং বুকে আবার অস্ত্রোপচার করা হয়।

এরপর জসিমের আর জ্ঞান ফেরেনি। তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ২৯ জুলাই সকাল ৯টার দিকে মারা যান জসিম উদ্দিন।

স্বামীর মরদেহ পেতেও নানা জটিলতার মুখে পড়েন রুমা। পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের কথা বলে হাসপাতাল থেকে মরদেহ দিতে দেরি করা হয়। বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় একাধিকবার ঘুরেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মামলা দায়েরের পর ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ পান এবং গ্রামের বাড়িতে দাফন করেন।

বিচার চাইতে এসে মেয়েকে হারানোর অভিযোগ

জবানবন্দিতে রুমা জানান, স্বামী হত্যার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে তিনি ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ঢাকায় আসেন। তার বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন।

রুমার অভিযোগ, ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় তার মেয়ে। তার দাবি, তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই মেয়েকে টার্গেট করা হয়েছিল।

ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়ার পর মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং তীব্র ট্রমায় আক্রান্ত হয় বলে জানান রুমা। একপর্যায়ে সে আত্মহত্যা করে।

মেয়ের এই পরিণতির কথা বলতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা বেগম।

জবানবন্দিতে তিনি আরও দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন গণমাধ্যম, ভাইরাল ভিডিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন—স্বামী হত্যার ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

তবে জবানবন্দিতে উত্থাপিত এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি বিচারাধীন এবং অভিযুক্তদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

স্বামী ও সন্তান হারিয়ে রুমা বেগমের এখন একটাই প্রত্যাশা—স্বামী জসিম উদ্দিন হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার।

একটি পরিবারের স্বজন হারানোর এই বেদনাবিধুর কাহিনি সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর জবানবন্দিতে উঠে আসে।