জিয়াউর রহমানের অভূতপূর্ব নেতৃত্ব: একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন-- প্রফেসর ড. শেখ আকরাম আলী

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ২:১৫ অপরাহ্ন, ৩০ মে ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৮ অপরাহ্ন, ৩০ মে ২০২৬



একটি জাতির সমৃদ্ধি ও সফলতার মূলে রয়েছে যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিরন্তন বিতর্ক—'নেতা কি জন্মায়, নাকি তৈরি হয়?' এর উত্তরে দেখা যায়, মানব ইতিহাসে দুই ধরনের নজিরই বিদ্যমান। আল্লাহর তলোয়ার খ্যাত খালিদ বিন ওয়ালিদ যেমন ছিলেন জন্মগত দূরদর্শী সামরিক নেতা, তেমনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর দীর্ঘ তীব্র সংগ্রাম ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য নেতায়।

দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা অনেক মহান নেতার দেখা পাই। প্রাচীন ভারতের সম্রাট অশোক কিংবা মধ্যযুগের সম্রাট আকবরের পর আধুনিক ভারতে আমরা পেয়েছি স্যার সলিমুল্লাহ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, সুরেশচন্দ্র ব্যানার্জি, জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্বদের। একইভাবে অবিভক্ত বাংলাও ধন্য হয়েছে স্যার আশুতোষ রায়, চিত্তরঞ্জন দাশ, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ক্ষণজন্মা নেতাদের পেয়ে; যাঁরা স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সাধারণ মানুষের অধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন।


ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা পেয়েছি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মতো অবিসংবাদিত জননেতাদের। তবে এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে যিনি একাধারে ক্যারিশম্যাটিক সামরিক নেতা এবং অনন্য এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক (Statesman) হিসেবে নিজেকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে নিয়েছেন, তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং নিখাদ দেশপ্রেমই তাঁকে আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।


জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের বিকাশ হঠাৎ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, ধীর অথচ সুদৃঢ়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদানের মধ্য দিয়েই তাঁর গতিশীল সামরিক নেতৃত্বের প্রথম ধাপ শুরু হয়—যে পেশাটি মূলত দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার সর্বোচ্চ দীক্ষা দেয়। একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি (PMA) কাকুলে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘প্লাটুন কমান্ডার’ নিযুক্ত হন, যা ছিল ভবিষ্যৎ সামরিক নেতৃত্ব তৈরির এক অনন্য সুযোগ। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তাঁর অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশল সমগ্র পাকিস্তানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিল।


তবে তাঁর জীবনের এবং এই জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে মহত্তম মাহেন্দ্রক্ষণটি আসে ১৯৭১ সালের মার্চে। ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্মম গণহত্যা শুরু করে, তখন তৎকালীন মেজর জিয়া রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৬শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে নিজের এবং পরিবারের (দুই শিশু সন্তানসহ) জীবন চরম ঝুঁকিতে ফেলে তিনি যে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তা দিকভ্রান্ত ও নিরাশ বাঙালি জাতিকে অবরুদ্ধ অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়। এই একটি ঘোষণা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তোলে।


মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি কিংবদন্তি ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তিনি জীবিত যোদ্ধাদের জন্য সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত হন। স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় পরবর্তী সময়ে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনে দেশ পরিচালনার এক বৃহত্তর গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে অর্পিত হয়। আর তখনই সামরিক গণ্ডি পেরিয়ে একজন সফল ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর প্রকৃত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে।


রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রথম ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত একটি জাতিকে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর এক মহৎ সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ দেশের সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে এক ছাতার নিচে এনেছিল এই দর্শন। তাঁর দ্বিতীয় যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ প্রতিষ্ঠা করা, যা আজও দেশের প্রধানতম জাতীয়তাবাদী শক্তি।

একই সাথে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটান, একদলীয় বাকশালের অবসান ঘটিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার পথ উন্মুক্ত করেন। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সাফল্য ছিল এককথায় বিস্ময়কর। স্নায়ুযুদ্ধের তৎকালীন দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থায়—যেখানে একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্ব এবং অন্যদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত—জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সুচতুর কূটনীতির মাধ্যমে পশ্চিমা ও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি চীনের সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, যা ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা থেকে বিরত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।


জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিরেট ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহায়তায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে একটি আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠিত করেন। দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে গতিশীল করতে পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসের আদলে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)’ প্রবর্তন করেন, যা আজও রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর প্রবর্তিত ‘সবুজ বিপ্লব’ (খাল খনন কর্মসূচি), তৈরি পোশাক শিল্প (গার্মেন্টস) খাতের সূচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির কালজয়ী সিদ্ধান্তগুলো আজকের স্বনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC)-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান রূপকার হিসেবে তিনি যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব কূটনীতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


মাত্র ছয় বছরেরও কম সময়ের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতে তাঁর গভীর মেধা ও সংস্কারের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ সংস্কারক। তাঁর এই অভূতপূর্ব সাফল্যের মূলে ছিল তিনটি প্রধান গুণ: সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং নিখাদ দেশপ্রেম। তিনি দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করতে পারতেন এবং একটি দক্ষ সিভিল ও মিলিটারি টিম গঠন করে লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত রাখতেন। সর্বোপরি, তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা (Integrity) তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও অপরাজেয় আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আজ এত বছর পরও আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিটি স্পন্দনে শহীদ জিয়ার দূরদর্শী কর্মের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।


লেখক:

মহাপরিচালক, জিয়া ইন্টারন্যাশনাল একাডেমী (জিয়া); সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল এবং আইন ও ইতিহাসের অধ্যাপক।