স্বাভাবিক জীবনটা আবার দুর্বিষহ, দায়ভার আপনাদের— মাছরাঙা টেলিভিশনকে পরীমনি

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ৪:১৯ অপরাহ্ন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:০৮ পূর্বাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। তার অভিযোগ, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিজের ও সন্তানদের ছবি ঘিরেও কটূক্তি করা হচ্ছে। এতে তার মানসিক শান্তি ও কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায় মাছরাঙা টেলিভিশনকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে পরীমনি মাছরাঙা টেলিভিশনের উদ্দেশে লেখেন, “ডিয়ার মাছরাঙা টেলিভিশন, আপনাদের এই জাস্ট একটা ফটো কার্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ কোন কাজে দিচ্ছে না একদমই।”

পোস্টে নিজের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “এই যে আমার স্বাভাবিক জীবনটা এভাবে আবার দুর্বিষহ করে দিয়েছেন এর সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাদের। আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন রকম কোন পোস্ট করতে পারছি না (হোক সেটা আমার কাজের বা আমার ব্যক্তিগত)। এমনকি আমার বাচ্চাদের ছবিও বাদ যাচ্ছে না হাজার হাজার হেটিং কমেন্টস থেকে।”

“কী করব বলেন এবার। আমার জীবনের মানসিক শান্তি নষ্ট করে দিলেন! আমার কাজ নষ্ট করে দিলেন। এরপর কি বাকি থাকল আর। আপনারা বলেছেন অপরাধিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন। আর কবে আনবেন সেটা। আমার কাছে অপরাধী তো এখন আপনারা।”

সম্প্রতি মাছরাঙা টেলিভিশনের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি পরীমনির একটি আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করে সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল।

ঘটনার পর মাছরাঙা টেলিভিশন দুঃখ প্রকাশ করে। তবে পরীমনির বক্তব্য, শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই এমন ঘটনার দায় শেষ হয়ে যায় না। তার অভিযোগ, ভিডিওটি আগে থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকলেও টেলিভিশনটির যাচাইকৃত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশের পর তা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাকে নতুন করে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার রাতে ফেসবুক লাইভে এসেও এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরীমনি। লাইভে তিনি বলেন, ভিডিওটি নতুন নয়; প্রায় এক থেকে দেড় বছর আগেই অনেকে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে সেটি পাঠিয়েছিলেন। তবে একটি যাচাইকৃত গণমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

মাছরাঙা টেলিভিশনের বক্তব্যের প্রসঙ্গে লাইভে পরীমনি বলেন, “ওরা এত বড় পাওয়ারফুল একটা মিডিয়া, ১১ ঘণ্টা তো ঝুলেই ছিল। তো প্রমাণ করতে পারল না? নিজেদের কন্ট্রোলে নিতে পারল না? আইন, এত প্রশাসন এগুলো দিয়ে কি সম্ভব ছিল না? এর বিপরীতে আপনি মোটেও বলতে পারেন না, পেজ হ্যাক হয়েছে। তাহলে আমিও বলি, আমার পেজ হ্যাক হয়েছে!”

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা বিষয়টি নিয়ে ‘অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাচ্ছেন’, তাদেরও সমালোচনা করেন পরীমনি। তিনি বলেন, অনেকে অন্যের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে গিয়েও ভিডিওটির লিংক খুঁজছেন। এমনকি অন্য প্রসঙ্গের পোস্টেও ভিডিওটি নিয়ে মন্তব্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নিন্দুকদের উদ্দেশে খোঁচা দিয়ে পরী বলেন, “তোমরা যখন ভিডিওটি নিয়ে এত মাতামাতি করছিলে, তখন আমার ইচ্ছে হচ্ছিল একটি খোলামেলা ফটোশুট করে ফেলি।” ভিডিওটি নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে পরীমনি বলেন, “যারা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কথা, তারা তা করেছেন। কিন্তু অনেকে ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।”

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “দিনশেষে ভিডিওটা আমিও দেখলাম, সকলেই দেখল। দেখার পর যারা এভয়েড করার দরকার, তারা স্কিপ করেছে। আর যারা এই ভিডিওকে নিজেদের জীবন, যৌবন, নিঃশ্বাস বানিয়ে ফেলেছে, তারা অনলাইনে এসেই এটা নিয়ে কথা বলছে। দেখা গেল, কেউ হজের পোস্ট করল, তার কমেন্ট বক্সেও গিয়ে লিখেছে, ‘পরীমনির লিংক আছে আমার কাছে’। মানে, তার জীবনের অর্জন যেন এটুকুই। ভুয়া একটা জিনিস নিয়ে তোমার এই অবস্থা, আসল হলে কী করতে!”

লাইভে ক্ষোভ প্রকাশের একপর্যায়ে নিজের পেছনে থাকা জুতার ক্যাবিনেট দেখিয়ে পরীমনি বলেন, সেখানে থাকা জিনিসগুলো আসল। ‘অরিজিনাল’ শব্দটি ব্যবহার করে তিনি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য বোঝানোর চেষ্টা করেন।

যারা তাকে গালাগাল করছেন, তাদের উদ্দেশেও কড়া বক্তব্য দেন এই অভিনেত্রী। তিনি জানান, কেউ তাকে আক্রমণ করলে তিনি চুপ থাকবেন না, পাল্টা জবাব দেবেন। মামলা করার পরামর্শের জবাবে আইনি পথে সময় নষ্ট না করে সরাসরি জবাব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। লাইভের শেষ দিকে সমালোচকদের নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে ইংরেজিতে পরীমনি বলেন, “ফোকাস অন ইউর লাইফ! গেট এ লাইফ, হানি।”

তবে শনিবার সকালে নিজের ফেসবুক পেজ থেকে ওই লাইভ ভিডিওটি সরিয়ে দেন পরীমনি। পরে এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে লেখেন, “Oops sorry! ডিলিট করে দিছি। শুভ সকাল।” তিনি এই পোস্টের মন্তব্যের ঘর বন্ধ রাখায় সেখানে অনুসারীদের মন্তব্য করার সুযোগ ছিল না।

মাছরাঙা টেলিভিশনের বক্তব্য

গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মাছরাঙা টেলিভিশন জানায়, তাদের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি ওই দিন ভোররাত থেকে অননুমোদিতভাবে হ্যাক করা হয়েছিল। পরে অ্যাকাউন্টটিতে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি কিছু ভুয়া ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার এবং আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার জন্য দিনভর চেষ্টা চালানো হয়। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বনানী থানা, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে অননুমোদিতভাবে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।

মাছরাঙা টেলিভিশন জানায়, তারা সব সময় শিল্পীদের সম্মান, মর্যাদা ও সৃজনশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তাদের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার করে যেসব শিল্পীর সম্মান ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে তারা গভীরভাবে মর্মাহত।

বিবৃতিতে সবাইকে ভুয়া কনটেন্ট সম্পর্কে বিভ্রান্ত না হওয়া, সেগুলো শেয়ার করে বিভ্রান্তি না ছড়ানো এবং যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহযোগিতাকারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কর্মকর্তা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ।

বিবৃতির শেষাংশে প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মাছরাঙা টেলিভিশন বলে, প্রযুক্তি যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, তেমনি এর অপব্যবহার অন্যের সম্মান, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তিকে কারও সম্মানহানির বদলে সৃজনশীলতা, ইতিবাচক পরিবর্তন ও দেশ গড়ার কাজে ব্যবহারের আহ্বান জানায় প্রতিষ্ঠানটি।