ধরা খেলেন কালো পোশাকের ‘শিক্ষা শিকারি’ বাশার
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এক অভূতপূর্ব অবদান (!) রেখে প্রায় শিক্ষাবিদ হয়ে ওঠা এম কে খায়রুল বাশার এখন পুলিশ হেফাজতে। মানি লন্ডারিং মামলায় বহুল আলোচিত ক্যামব্রিয়ান কলেজ ও বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান বাশারকে জালে আটকেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
লায়ন বাশার— একজন ‘স্বপ্ন বিক্রেতা’, যিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে কল্পনার ক্যাম্পাসে পাঠিয়ে দিয়েছেন, অথচ ভিসা বা প্লেন টিকিট— কিছুই লাগেনি। টাকা দিলেই শিক্ষা, আর বিশ্বাস করলেই উন্নত দেশ— এ এক অভিনব উদ্যোগ, যার নাম বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম টিম সোমবার বাশারকে (৫৪) গ্রেফতার করেছে মানি লন্ডারিং মামলায়। এর আগেই অবশ্য ‘ভুক্তভোগী সহস্রাধিক শিক্ষার্থী’ ব্যানারে রাজু ভাস্কর্যের সামনে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনে জানিয়েছিলেন—খায়রুল বাশার ও তার প্রতিষ্ঠানের হাতে তারা হয়েছেন ‘আন্তর্জাতিক মানের’ প্রতারণার শিকার।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে গড়ে ২০ লাখ টাকা করে নিয়েছে বিএসবি। মোট টাকার পরিমাণ নিয়ে দুই রকম তথ্য আছে— একটি পক্ষ বলছে ২০০ কোটি, আরেক পক্ষ বলছে ৫০০ কোটি। সিআইডির তদন্তে নিশ্চয় প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
ভুয়া অফার লেটার? হ্যাঁ, সেগুলো এত নিখুঁত ছিল যে কেউ কেউ সন্দেহ করেছিল সেটাই আসল। সিল, স্বাক্ষর, কলেজ লোগো— সবকিছু এতটাই ‘স্মার্টলি ডিজাইনড’ যে সন্দেহ করাটাই ‘অশিক্ষার প্রমাণ’ বলে ধরে নেওয়া যেত। শিক্ষার্থীরা জানান, তালিকা অনুযায়ী ৮৫০ জন বিদেশে যেতে পারেননি। কিন্তু বাস্তবে সে সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
কখনো কানাডা, কখনো আমেরিকা—সবার জন্য ছিল একেকটা স্বপ্নপথ, যেটা শুরু হয় ডলার চিহ্ন দিয়ে, আর শেষ হয় ব্যাংক ফেরত চেক দিয়ে।
টাকা ফেরত চাইলে কী পাওয়া গেছে? কিছু ‘গুন্ডা আতিথেয়তা’, কিছু ‘ব্যাংকে ডিজঅনার্ড চেক’, আর কিছু ‘চুপ করে থাকো, নয়তো খবর আছে’ ধাঁচের হুমকি। তারপরও শিক্ষার্থীরা যখন হাল ছাড়েননি, বাশার তখন প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে নম্বর বন্ধ করে নিজেই গায়েব। ঠিক যেন পেছনে ধোঁয়া ফেলে উধাও হওয়া জাদুকর!
তবে বাশার শুধু প্রতারক নন, তিনি একজন ব্র্যান্ড গড়ার কারিগর। তার প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিংস কলেজ, উইনসাম স্কুল, এভিয়েশন কলেজ, কালচারাল একাডেমি, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট— সব মিলিয়ে পুরো একটি ‘শিক্ষা সাম্রাজ্য’। আর সব শিক্ষার মূলে ছিল ‘সেলস পিচ’। তিনি চেয়েছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও খুলতে, শেষ পর্যন্ত যা করে উঠতে পারেননি।
বাশারের বাণী শুনতে চান? তার ওয়েবসাইটের বক্তব্য— “আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বিএসবি ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত ক্যামব্রিয়ান, মেট্রোপলিটন, কিংস, উইনসাম ও নর্থ সিটি কলেজ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। পরিপাটি, আদর্শ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশের নানা পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে ক্যামব্রিয়ান কলেজ। দেশের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএসও সনদপ্রাপ্ত এই কলেজের শিক্ষাপদ্ধতি বাংলাদেশের শিক্ষাপরিকল্পনায় এক যুগান্তকারী মডেল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।”