বায়ু-শব্দ-দৃষ্টি-পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ

Tajuddin Ahmed
Tajuddin Ahmed Tajuddin Ahmed
প্রকাশিত: ৪:২৬ অপরাহ্ন, ২৫ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:১৪ অপরাহ্ন, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

রিপোর্ট : তাজউদ্দীন আহমদ 

ঢাকা, ২৫ আগস্ট ২০২৬: বায়ু, শব্দ, দৃশ্য, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত “বায়ু-শব্দ-দৃষ্টি-পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ: প্রতিকার কতদূর?” শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে।

সেমিনারে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে মধ্যমেয়াদে শব্দদূষণ বিধিমালা ২০২৫-এর কঠোর প্রয়োগ, নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ঘণ্টায় ৩০-৪০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ, একমুখী সড়কব্যবস্থা এবং যানবাহনের নিয়মিত শব্দ পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে Noise Insulation বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও উঠে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাক্রমে শব্দদূষণ ও নাগরিক দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক ডিজিটাল শব্দ মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে হর্নমুক্ত শহর, বৈদ্যুতিক বাসের (EV Bus) সম্প্রসারণ, কোলাহলপূর্ণ শিল্পকারখানা শহরের বাইরে স্থানান্তর এবং একটি স্বতন্ত্র শব্দ মনিটরিং সংস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এসবকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নে Smart City Masterplan গ্রহণেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সেমিনারে দৃশ্যদূষণকেও ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আলোচনায় বলা হয়, অপরিকল্পিত নগর কাঠামো, ঝুলন্ত বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অগোছালো তার, অবৈধ বিলবোর্ড, ব্যানার-পোস্টার, নির্মাণসামগ্রী, উন্মুক্ত বর্জ্য এবং অতিরিক্ত LED ও নিয়ন লাইটিং নগরের সৌন্দর্য ও বসবাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ESDO-এর গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকায় বিলবোর্ডের সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৫১ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৯৯৭টিতে পৌঁছেছে। এর ফলে নগরবাসীর চোখের ক্লান্তি, মাথাব্যথাসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নগরের নান্দনিকতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দৃশ্যদূষণ কমাতে স্বল্পমেয়াদে অবৈধ পোস্টার অপসারণ, রাত ১০টার পর অতিরিক্ত LED লাইট নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট সাইনবোর্ড ডিজাইন গাইডলাইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। মধ্যমেয়াদে ঝুলন্ত তার গুছিয়ে ফেলা, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ Utility Line স্থাপন এবং সমন্বিত Urban Design Guideline চালুর কথা বলা হয়। দীর্ঘমেয়াদে শহরজুড়ে ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি ব্যবস্থা ও Smart City Masterplan বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সেমিনারে বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে ঢাকাতেই উৎপন্ন হয় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টন। শহরাঞ্চলে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ২০০৫ সালের প্রায় ৩ কেজি থেকে বেড়ে প্রায় ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় এ পরিমাণ প্রায় ২২ দশমিক ২৫ কেজি। দেশে বছরে প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয় এবং মোট বর্জ্যের একটি বড় অংশ অপরিকল্পিতভাবে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে বলেও আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিল্পবর্জ্য, ই-বর্জ্য, লিচেট ও প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-খাল, জলাশয়, ভূগর্ভস্থ পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলা ও পোড়ানো বন্ধে অভিযান, ২০০২ সালের পলিথিন নিষেধাজ্ঞার কঠোর বাস্তবায়ন এবং নদী-খাল থেকে বর্জ্য অপসারণে বিশেষ অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন।

এছাড়া বাসাবাড়িতে উৎস পর্যায়ে জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথক করার ব্যবস্থা, কম্পোস্টিং, পৌরসভায় রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন, সুপারশপে বিকল্প ব্যাগ বাধ্যতামূলক করা এবং প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত বর্জ্য অবকাঠামো, Waste-to-Energy প্রকল্প, Sanitary Landfill, শিল্পবর্জ্য নিষ্পত্তি কেন্দ্র এবং ২০২৬ সালের Extended Producer Responsibility (EPR) নির্দেশিকা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, শুধু অভিযান বা জরিমানার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ মনিটরিং, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরকে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর, পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য নগরে পরিণত করা সম্ভব।