ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ রক্ষা-সংক্রান্ত সভায় এ নির্দেশনা দেন তিনি।
সভা শেষে এ তথ্য জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী আগামী এক মাসের মধ্যে এ কর্ম পরিকল্পনা জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
দক্ষিণ সিটির প্রশাসক বলেন, দূষণ যেন না বাড়ে, সেজন্য প্রতিটি কারখানায় ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নদী না বাঁচলে ক্ষতির মুখে পড়বে মানুষ ও পরিবেশ। যারা এ নির্দেশনা মানবে না, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।
সারা দেশের নদী দূষণমুক্ত করা হবে জানিয়েছে সিটি প্রশাসক জানান, সারা দেশের জন্যই হবে। তবে এই মুহূর্তে ঢাকাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রমটি শুরু হবে।
বিটিভির মহাপরিচালক কে এই কাজী জেসিন?
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) নতুন মহাপরিচালক (গ্রেড-১) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক কাজী জেসিন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের পরিচিত মুখ কাজী জেসিন। তিনি একাধারে সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক, লেখক ও কবি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সাংবাদিকতায় সক্রিয় থাকা কাজী জেসিন বিভিন্ন সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন।
গাইবান্ধা জেলায় জন্ম নেওয়া কাজী জেসিন যুক্তরাজ্যের কামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেকসই উন্নয়ন ও নেতৃত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। লেখালেখির শুরু করেন ১৯৯৭ সালে লিটল ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন।
পেশাগত জীবনে কাজী জেসিন দৈনিক আমার দেশ, এনটিভি, চ্যানেল ওয়ান, একুশে টেলিভিশন, বাংলাভিশন ও যমুনা টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
টেলিভিশন সাংবাদিকতায় তার অন্যতম আলোচিত কাজ হলো রাজনৈতিক টকশো ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’। অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক বিষয়, জনস্বার্থ ও সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতেন। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও এই অনুষ্ঠান নিয়ে দর্শকদের সামনে ফিরছেন তিনি।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য অঙ্গনেও রয়েছে কাজী জেসিনের পরিচিতি। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘জোৎস্নামত্ত যাত্রা’ (১৯৯৭) এবং ‘তানানুম তানানুম’ (২০১০)।
বর্তমানে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করছেন কাজী জেসিন। সাংবাদিকতা, টেলিভিশন উপস্থাপনা ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
দেশ ছাড়ার পর হাসিনা পরিবারের সদস্যরা এখন কোথায়?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগে ও পরে তার পরিবারের সদস্য এবং নিকটাত্মীয়দের প্রায় সবাই দেশ ছেড়েছেন। জানা গেছে, তাদের অধিকাংশ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া কেউ কেউ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও দুবাইয়ে রয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা। জানা যায়, তিনি বর্তমানে লন্ডন ও ভারতের মধ্যে যাতায়াত করছেন। সেদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকও তাদের সঙ্গে ছিলেন।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। সরকার পতনের পর তিনি ভারতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল), যিনি ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন, বর্তমানে দিল্লি ও দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে গণমাধ্যমের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) সরকার পতনের সময় থাইল্যান্ডে ছিলেন। তার স্ত্রী ফিনল্যান্ডের নাগরিক। রেহানার আরেক মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও দেশটির পার্লামেন্ট সদস্য। অপর মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীও যুক্তরাজ্যে থাকেন।
পরিবারের বাইরে শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয়দের বড় অংশও দেশ ছেড়েছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন। তার ছেলে শেখ ফজলে নাঈমও কলকাতায় রয়েছেন এবং আরেক ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম সরকার পতনের আগেই দেশ ছাড়েন।
যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ সরকার পতনের পর ভারত হয়ে কানাডায় যান। পরে তিনি আবার ভারতে ফিরেছেন। শেখ ফজলুর রহমান মারুফ বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।
শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সরকার পতনের আগেই ভারতে যান বলে জানা গেছে। তার ছেলে আশিক আবদুল্লাহও তার সঙ্গে ভারতে গেছেন। আরেক ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবুল খায়ের আবদুল্লাহও সরকার পতনের পর ভারতে চলে যান বলে দলীয় সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলও বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। কলকাতার নিউ টাউন এলাকার একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে তারা বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ও ভারতে রয়েছেন। শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের স্ত্রী শাহানা ইয়াসমিন শম্পাও তার সঙ্গে আছেন। তবে শেখ হেলালের আরেক ভাই শেখ সোহেলের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়নি।
শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী) ও মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) সরকার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান।জানা গেছে, তারাও বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার স্বজনদের মধ্যে কেবল আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকায় গ্রেফতার হন। তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং রাজনৈতিকভাবে তেমন পরিচিত ছিলেন না।
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনার স্বজনদের অনেকেই সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে তারা নিরাপদে দেশ ছাড়তে সক্ষম হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ। তবে দলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী দেশ ছাড়তে না পারায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলেও দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।
নিউজ সূত্র: যুগান্তর
দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে: জ্বালানি মন্ত্রী
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু
মহেশখালী থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা ইসিতে পাঠিয়েছে সংসদ
২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ভোটার তালিকা পাঠিয়েছে সংসদ সচিবালয়। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ইসির কাছে এই তালিকা পাঠানো হয়।তালিকা পাওয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল বা তারিখ ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।
এর আগে সংসদ সচিবালয়ের কাছে ভোটার তালিকা চায় নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি ইসি সচিব ভোটার তালিকা চাওয়ার তথ্য জানিয়েছিলেন।
গত সোমবার নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছিলেন, তারা ভোটার তালিকার জন্য পার্লামেন্ট সেক্রেটারিয়েটে অনুরোধ করেছেন।
ভোটার তালিকা পাওয়ার পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ এবং শিডিউল এই জিনিসগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
গত ২৪ জুলাই ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অসুস্থতা দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। সেই পদেই এখন ভোটের প্রস্তুতি চলছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেবল সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে থাকেন।
তাই তাদের তালিকা নিয়ে ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে ইসি।
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
সরকারকে ব্যর্থ করতে একটি দল চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে : রিজভী
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দেশে গ্যাস, হাম, ডেঙ্গুসহ সব ধরনের সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজ করে যাচ্ছেন। তার অঙ্গীকার মোতাবেক জনগণকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি কাজ করছেন।কিন্তু সরকারকে ব্যর্থ করতে দেশের বিরুদ্ধে একটি দল চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েও তাকে ব্যর্থ করতে নানা চক্রান্ত হয়েছে। এখনো তেমন চক্রান্ত হচ্ছে।
ইস্তাম্বুলে যথাযোগ্য মর্যাদায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস পালিত
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ পালিত হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালায় ইস্তাম্বুলে বসবাসরত বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশাজীবী ব্যক্তি, বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যবৃন্দ, কনস্যুলেট জেনারেলের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হয়। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বাণী পাঠ করেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। এরপর দিবসটিকে উপজীব্য করে নির্মিত ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরবর্তী সময়ে দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভার মূল বক্তব্যে কনসাল জেনারেল মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কনসাল জেনারেল এ গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের অবদান ও আত্মত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। শহীদদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা তাদের আলোচনায় গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণসহ এ সময়ের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর স্মৃতিচারণ করেন।
তারা গণ-অভ্যুত্থানের এ চেতনা ধারণ করে জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।
একই সাথে বক্তারা বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস এবং শহীদদের আত্মত্যাগের বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথভাবে তুলে ধরতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পরে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক: প্রতারণা নাকি ধর্ষণ?— প্রফেসর ড. আসিফ মিজান,
আধুনিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের অন্যতম জটিল এবং সংবেদনশীল বিতর্কটি আবর্তিত হচ্ছে ‘স্বাধীন সম্মতি’ (Autonomous Consent), ‘প্রতারণা’ (Deception/Cheating) এবং ‘ধর্ষণ’ (Rape)-এর পারস্পরিক সীমারেখাকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিচারিক আঙিনা ও সামাজিক আলোচনায় একটি বিশেষ প্রবণতা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে—পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সম্পর্ক পরবর্তীতে কোনো কারণে পরিণয়ে রূপ না নিলে, তাকে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ (Rape under the pretext of marriage) হিসেবে মামলাভুক্ত করা হচ্ছে। একজন শিক্ষক এবং আইন, রাজনীতি ও মানবাধিকার বিশ্লেষক হিসেবে এই ধারা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, সম্মতিমূলক শারীরিক সম্পর্কের পর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারা সামাজিক বা নৈতিকভাবে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ কিংবা দেওয়ানি ‘প্রতারণা’ হতে পারে; কিন্তু আইনি ও সংজ্ঞাগতভাবে তাকে কোনোভাবেই ‘ধর্ষণ’ বা ‘ফৌজদারি বলপ্রয়োগ’ আখ্যা দেওয়া যায় না।
আইনতাত্ত্বিক সংকট ও আইনি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটঃ
বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৫ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০)-এর ৯ ধারায় ধর্ষণের যে অপরাধতাত্ত্বিক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হলো—বলের ব্যবহার (Actus Reus), সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক মানসিক উদ্দেশ্য (Mens Rea), আকস্মিক জবরদস্তি এবং কার্যকর ‘সম্মতি’র অনুপস্থিতি। এই ধারার সাথে দণ্ডবিধির ৯০ ধারায় বর্ণিত ‘তথ্যের বিভ্রান্তি’ (Misconception of Fact)-কে যুক্ত করে এতদিন একটি সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা তৈরি রাখা হয়েছে। যুক্তি দেওয়া হয়, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে সম্মতি নেওয়া হয়েছে, তা আইনি দৃষ্টিতে ‘অকার্যকর’ বা ‘বাতিলেযোগ্য’।
তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক আইন সংস্কার এবং জুরিসপ্রুডেন্সিয়াল ডকট্রিনগুলোতে (Legal Doctrines) এটি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, সম্পর্ক শুরুর প্রথম দিন থেকেই ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’ (False Promise/Intentional Deception) এবং আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক, পারিবারিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রক্ষা করতে না পারা ‘ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতি’ (Breach of Promise)-এর মধ্যে গভীর গুণগত তফাত রয়েছে। জন লকের ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ (Social Contract Theory) এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘ক্ষতি তত্ত্ব’ (Harm Principle) অনুযায়ী, রাষ্ট্র কেবল তখনই নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর ফৌজদারি দণ্ড আরোপ করতে পারে, যখন সেখানে তাৎক্ষণিক বলপ্রয়োগ বা সুস্পষ্ট জবরদস্তি বিদ্যমান থাকে। দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে প্রদত্ত সম্মতিকে পরবর্তী ঘটনার প্রেক্ষিতে পেছনের দিকে গিয়ে (Retrospective effect) বাতিল ঘোষণা করা আইনশাস্ত্রের ‘নিশ্চয়তা নীতি’র (Principle of Legal Certainty) পরিপন্থী।
লিঙ্গীয় সমতা বনাম ‘সেক্স-বায়েসড’ আইনি কাঠামোঃ
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় আইনি ও তাত্ত্বিক সংকটটি দেখা দেয় যখন আমরা আইনের নিরপেক্ষতা ও লিঙ্গ-সমতার প্রশ্নটি উত্থাপন করি। সমকালীন আইনশাস্ত্রে ‘সেক্স-বায়েসড আইন’ (Sex-Biased Legislation) বলতে এমন আইনি কাঠামোকে বোঝায়, যা অপরাধের বস্তুনিষ্ঠ উপাদান মূল্যায়নের চেয়ে পক্ষগণের লিঙ্গীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
যদি তত্ত্বগতভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, বিয়ের প্রতিশ্রুতির কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার যৌক্তিক ক্ষমতা (Cognitive Agency) হারিয়ে ফেলেন, তবে তা প্রকারান্তরে নারীর বুদ্ধিমত্তা ও নিজস্ব স্বত্বাকে অবমূল্যায়ন করে—যা আধুনিক নারীবাদের (Modern Feminism) মূল দর্শনের সাথেও সাংঘর্ষিক। আরও বড় আইনি প্রশ্ন হলো: পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার পর কোনো নারী যদি প্রতিশ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করতে অস্বীকার করেন, তবে সংক্ষুব্ধ পুরুষ কি আইনত নিজেকে ‘ধর্ষিত’ দাবি করে প্রতিকার পেতে পারেন? প্রচলিত আইনে সে সুযোগ নেই। সম্মতি এবং প্রতিশ্রুতি ভাঙার দায় যদি কেবল একপক্ষের ওপর চাপানো হয়, তবে তা সংবিধানপ্রদত্ত সমতার নীতির (Equality before Law) চরম লঙ্ঘন। পারস্পরিক সম্মতিমূলক সম্পর্কের পর যিনিই ওয়াদা ভঙ্গ করুন না কেন, সেখানে বাহ্যিক বলপ্রয়োগ না থাকায় তা কোনোভাবেই ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে না।
সাংবিধানিক অধিকার ও ধর্ষণের সংজ্ঞার লঘুকরণঃ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার (Right to Liberty) মৌলিক নিশ্চয়তা দেয়। যখন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দে ও পারস্পরিক সম্মতিতে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়ান, তখন তা তাদের সাংবিধানিক স্বাধীনতারই অনুষঙ্গ। পরবর্তীতে পরিণয় ঘটেনি বলে এই পারস্পরিক সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করলে তা নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপকে (State Paternalism) প্ররোচিত করে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ‘ধর্ষণ’ শব্দটির এমন শিথিল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার প্রকৃত ধর্ষণের শিকার নারীদের কঠিন আইনি লড়াইকে চরমভাবে লঘু করে দেয়। একজন প্রকৃত ভুক্তভোগী যে জঘন্য ট্রমা এবং শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যান, তার সাথে স্বেচ্ছায় দীর্ঘদিন সম্পর্কে থাকার পর বিয়ে না হওয়ার সামাজিক ক্ষোভকে এক করে ফেলা মানবাধিকারের মূল দর্শনের পরিপন্থী। ধর্ষণের মতো একটি গুরুতর অপরাধের সংজ্ঞাকে এভাবে প্রসারিত করলে বিচারালয়ের অমূল্য সময় নষ্ট হয় এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল হওয়ার আইনি ফাঁক তৈরি হয়।
যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বনাম অপরাধমূলক উদ্দেশ্য (Mens Rea)ঃ
মানুষের জীবন ও সামাজিক সম্পর্ক কোনো একক সরলরেখায় চলে না। একটি দীর্ঘ সম্পর্কের পর সামাজিক জটিলতা, পারিবারিক অসম্মতি, অর্থনৈতিক সংকট, মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কিংবা জাত-ধর্মের ভিন্নতার কারণে পরিণয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়তেই পারে। জীবন ও সমাজের এই বাস্তব রূপান্তরকে আইনত ‘অপরাধমূলক মানসিক উদ্দেশ্য’ বলা চলে না।
ফৌজি আইনে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে হলে প্রাথমিক থেকেই তার অপরাধমূলক মানসিকতা প্রমাণ করা আবশ্যক। সম্পর্ক শুরুর প্রথম দিন থেকেই যদি কারো উদ্দেশ্য থাকে যে সে কেবল শারীরিক সম্পর্কের স্বার্থেই মিথ্যা নাটক সাজাচ্ছে—তবেই কেবল তা প্রতারণার (দণ্ডবিধির ৪১৭ বা ৪২০ ধারা) আওতায় বিচার্য হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কে থাকাকালীন পরিণয়ের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব না হলে, তাকে কোনোভাবেই ‘ধর্ষক’ বলা চলে না।
আন্তর্জাতিক বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী পথরেখাঃ
বিশ্বের আধুনিক আইনি ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলো সম্মতিমূলক সম্পর্ক ও বলপ্রয়োগের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রেখা টানে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অনুরাগ সোনি বনাম ছত্তিশগড় রাজ্য এবং প্রমোদ সূর্যভানু পাওয়ার বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য মামলায় ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন—
"সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই ধর্ষণ নয়; শারীরিক সম্পর্কের উদ্দেশ্যে দেওয়া ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’ এবং পরিস্থিতির শিকার হয়ে ‘ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতি’র মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।"
পশ্চিমা আইনশাস্ত্রেও সম্মতিমূলক সম্পর্কের পর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে একটি দেওয়ানি চুক্তিভঙ্গ বা বড়জোর সাধারণ প্রতারণা হিসেবে দেখা হয়, কখনোই একে ফৌজদারি জবরদস্তির সমতুল্য করা হয় না।
সম্পর্কের ধরণ >আইনি শ্রেণীকরণ >প্রযোজ্য আইনি নীতি / ধারাঃ
> বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তিমূলক সম্পর্ক:
ফৌজদারি অপরাধ (ধর্ষণ) দণ্ডবিধি ৩৭৫ / নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ৯ ধারা
> শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি:
দেওয়ানি/লঘু ফৌজদারি প্রতারণা দণ্ডবিধি ৪১৭ / ৪২০ ধারা
>পরিস্থিতিগত কারণে ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতি:
সাধারণ চুক্তিভঙ্গ / নৈতিক স্খলন দেওয়ানি প্রতিকার (Civil Redress)
আইনি রূপরেখা ও উপসংহারঃ
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক বিশ্বাসভঙ্গ ও নৈতিক স্খলন। এর জন্য নির্দিষ্ট দেওয়ানি বা লঘু ফৌজদারি প্রতিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে ‘ধর্ষণ’-এর মতো একটি চরম ও জঘন্য অপরাধের মোড়কে সাজানো বিচারিক সংস্কৃতির একটি বড় বিচ্যুতি।
আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা—কোনো পক্ষকে সামাজিক বা মানসিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার তুলে দেওয়া নয়। প্রকৃত ধর্ষণের ভয়াবহতাকে অক্ষুণ্ন রাখতে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনি সমতা বজায় রাখতে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ নামক এই সংজ্ঞাগত ধারণার জরুরি পুনর্বিবেচনা এবং লিঙ্গ-নিরপেক্ষ আইনি সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
লেখকঃ — প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।