মূলনীতিতে শরিয়া-ইসলামসহ রাষ্ট্র গঠনে ৮ দফা ইসলামী আন্দোলনের
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে শরিয়া আইন ও ইসলামকে বাস্তবায়নসহ রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত আট দফা ঘোষণা করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম। জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি রাষ্ট্র গঠনে ছয় দফার পাশাপাশি তার দলের নির্বাচনি ইশতেহারের মৌলিক ৩০ দফাও তুলে ধরেন।
মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম বলেন, শরিয়া কেবলই একটি আইনের নাম নয়; বরং শরিয়া হলো মানুষের বিশ্বাস, জীবনবোধ, সংস্কৃতি, অভ্যাস ও আইনের সমষ্টি। আমরা এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস হিসাবে, জীবনবোধ হিসেবে এবং সংস্কৃতিতে অভ্যাসে ইসলামকে ধারণ করি। এখন যদি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলেই বাংলাদেশ তার প্রত্যাশিত সমৃদ্ধি ও লক্ষ্য খুঁজে পাবে ইনশাআল্লাহ।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেওয়া নির্বাচনি ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে জনগণের উদ্দেশে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিতে বিটিভি এ ভাষণ প্রচারের আয়োজন করেছে।
দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের শুরুতেই আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান চরমোনাই পির। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মানুষের মুক্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সংগঠিত সব আন্দোলন ও সংগ্রামে অংশ নেওয়া জাতির সাহসী সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
১৯৮৭ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নামে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নাম ধারণ করাসহ দলটির গত প্রায় চার দশকের যাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র মুফতি রেজাউল করিম তুলে ধরেন ভাষণে। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে সবাই একমত যে সংবিধানই প্রধানতম সমস্যা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কার করার একটি সুযোগ পেয়েছি।
সেই সুযোগকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত প্রস্তাবনার গণভোটকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন চরমোনাই পির। তিনি বলেন, আপনার একটি ভোট মহান স্বাধীনতা ও চব্বিশের জুলাইয়ের প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত করতে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ।
ভোটারদের ভোট দেওয়ার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে চরমোনাই পির বলেন, ভোট অর্থ হলো কাউকে আপনার হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া। ভোট অর্থ কাউকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতর বলে সাক্ষ্য দেওয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন— ‘যে ভালো সুপারিশ করবে তা থেকে তার জন্য একটি অংশ থাকবে এবং যে মন্দ সুপারিশ করবে তার জন্য তা থেকে একটি অংশ থাকবে।’ (সূরা আন-নিসা, ৮৫)
কোরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, অর্থ খুবই স্পষ্ট— আপনি যদি ভোটের মাধ্যমে কোনো ভালো নীতি ও ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন তাহলে সেই ভালো নীতি ও ব্যক্তির কৃত ভালো কাজের নেকি আপনি পাবেন। আর যদি আপনি কোনো খারাপ নীতি ও ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন তাহলে সেই খারাপ নীতি ও ব্যক্তির করা অপরাধের পাপের ভাগ আপনার আমলনামাতেও যুক্ত হবে।
এ আয়াতের আলোকে ভোট দিতে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুফতি রেজাউল করিম বলেন, কোনো দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও টাকা পাচার না করেও কেবল ভুল জায়গায় ভোট দেওয়ার কারণে আপনার আমলনামায় দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের পাপ যুক্ত হতে পারে। তাই ভোট প্রদান কেবল ইহকালীন বিষয়ই নয়, বরং একই সঙ্গে একটি পরকালীন বিষয়ও বটে। তাই ভোট প্রদানে সতর্ক থাকতে হবে।
‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’ শিরোনামে দলীয় ইশতেহারের কথা তুলে ধরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির বলেন, ইশতেহারকে আমরা তিনটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করছি— রাষ্ট্র গঠনে আমাদের নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কারে আমাদের পরিকল্পনা ও খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং মৌলিক ইশতেহার শিরোনামে ৩০টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
ভাষণে রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত আট দফা ঘোষণা তুলে ধরেন সৈয়দ রেজাউল করিম। এ আট দফা হলো—
- রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার পরিপালন;
- ক্ষমতার চর্চা ও হস্তান্তরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসরণ। একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে;
- সব ধর্ম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সম্মান রক্ষায় প্রতিশ্রুতি। আমরা কাউকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বিবেচনা করব না;
- পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতামূলক বৈদেশিক সম্পর্ক;
- রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। সংবিধানে নির্ধারিত ‘ন্যায়পাল’ প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে কার্যকর করা হবে;
- বৈষম্য বিরোধিতা ও ন্যায্যতা। একটি কার্যকর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হবে;
- দুর্নীতির মূল উৎপাটন। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য শাস্তি নিশ্চিত করা হবে; এবং
- নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা।
এ সময় রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ছয় দফা তুলে ধরেন তিনি। এ ছয় দফা হলো—
- মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি দায়বদ্ধতা;
- পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন;
- ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা;
- সেবাভিত্তিক দক্ষ ও সৎ জনপ্রশাসন গড়ে তোলা;
- রাজস্ব পরিধির সম্প্রসারণ; এবং
- স্বনির্ভর শক্তিশালী ও বহুমাতৃক ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তোলা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নির্বাচনি ইশতেহারের মৌলিক ৩০টি পয়েন্টও ভাষণে তুলে ধরেন মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম। এগুলো হলো—
- রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন;
- দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকমুক্ত কল্যাণ রাষ্ট্র;
- সাম্য ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা;
- রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র শরীয়ার প্রাধান্য;
- কৃষি ও শিল্প বিপ্লব;
- কর্মমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা;
- সার্বজনীন কর্মসংস্থান;
- পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্র সংস্কার;
- জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতা;
- আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি;
- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা;
- বৈষম্য বিলোপ;
- উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা;
- পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা;
- ধর্মীয় স্বাধীনতা;
- দুর্নীতি নির্মূল;
- ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা;
- পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন;
- ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয়;
- অপরাধীদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধকরণ;
- গুম-খুন ও জুলুমের বিলুপ্তি;
- সংবাদপত্রের স্বাধীনতা;
- নারীদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা;
- শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য অনস্টপ সার্ভিস;
- সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ;
- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন;
- নিরাপদ সড়ক;
- ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়া;
- শ্রমের মর্যাদা; এবং
- সরকারি চাকরিজীবীদের সম্মানজনক পে-স্কেল।
ইসলামী আন্দোলনের আমির নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে ১২ দফা বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে বলে ঘোষণা দেন। এই ১২ দফা হলো—
- প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা হতদরিদ্রদের নগদ সহায়তা;
- শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন একবেলা পুষ্টিকর খাবার;
- ১৮ থেকে ২৪ বছরের যুবদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ;
- স্বাস্থ্য কার্ড ও কৃষি কার্ড চালু;
- ন্যাশনাল জব পোর্টাল তৈরি;
- কর্মজীবী মায়েদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র;
- সরকার নিয়ন্ত্রিত বাস ব্যবস্থাপনা;
- সেবাকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা;
- নির্বিঘ্ন নাগরিক সেবা;
- নারী পোশাক কর্মীদের আবাসন;
- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া; এবং
- কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন।
তরুণদের কাছে দলীয় প্রতীক হাতপাখার পক্ষে ভোট চেয়ে চরমোনাই পির বলেন, প্রিয় তারুণ্য, তোমরা এবার প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছ। তোমাদের প্রথম ভোট হোক পরিবর্তনের পক্ষে, হাতপাখা প্রতীকে। আমি কথা দিচ্ছি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তোমাদের ভোট নিয়ে নিজেদের আখের গুছাবে না; বরং তোমাদের জন্য উন্নত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়ে মুফতি রেজাউল করিম বলেন, প্রিয় দেশবাসী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে দেশ থেকে স্বৈরতন্ত্রের স্থায়ী বিলোপ নিশ্চিত করতে আমরা সংস্কার কমিশনে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছি। জুলাই সনদ কোনো দলের বিপক্ষে না। তাই আগামী ১২ তারিখে জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করুন।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও দেশবাসীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির বলেন, আপনারা রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত। ভীতি ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখুন। প্রিয় দেশবাসী, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দলে দলে ভোট কেন্দ্রে আসুন। সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু মানুষের প্রতীক হাতপাখা প্রতীকে ভোট দিন। কথা দিচ্ছি, শান্তি ও মুক্তি আসবে ইনশাআল্লাহ।