নতুন বাংলাদেশে’ ভোটের প্রচারে দোষারোপের রাজনীতির ‘পুরনো কাসুন্দি’
নানা কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ‘রাতের ভোট’, ‘বিনা ভোটে’ এমপি, ভোট দিয়ে গিয়ে ভোট হয়ে যাওয়া দেখতে পাওয়া, ‘আমি ও ডামি’র নির্বাচন— এমন নানা অভিযোগ ঘিরে ছিল এই তিন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নয়, বিশ্লেষকরাও বলে আসছিলেন, মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে।
এরপর এলো জুলাই অভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ঘোষণা দিলেন, সংস্কার আর বিচারের পাশাপাশি তার ম্যান্ডেট সুষ্ঠু একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া, ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মাথায় এলো কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন। তফসিল, মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, আপিল পেরিয়ে এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুরু হয়েছে প্রচার। বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রতীক পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নেমেছেন প্রচারের মাঠে।
বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে এসেছিল ইতিবাচক সব বার্তা। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’কে নতুন করে গড়ে তোলার বার্তা দিয়েছিলেন তারা। পুরনো দিনের পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি ভুলে গণতান্ত্রিক চর্চা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের কথাও বলেছিলেন।
ভোটের প্রচারের মাঠে নামতেই দেখা গেল, এত সব প্রতিশ্রুতি, ইতিবাচক বার্তা যেন নিছক কথার কথা। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)— তিন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কণ্ঠেই উঠে এলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার বার্তা।
বৃহস্পতিবার মিরপুর-১০ আদর্শ স্কুল মাঠের জনসভা দিয়ে নিজ আসন ঢাকা-১৫ আসনের প্রচার শুরু করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। জনসভায় নিজেকে ১০ দল সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর বক্তব্য দিতে গিয়ে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে নানা অভিযোগ তুলে ধরতে থাকেন
শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। ট্যাক্সের বাইরে কিন্তু একটা বেসরকারি ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে হকারের কাছে, এমনকি রাস্তার পাশে বসে যে ভাই-বোনটি ভিক্ষা করে, তার কাছ থেকেও একটা ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্সের টাকা আমরা আমাদের জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই না। শুধু তাই না, ওই ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ।
‘ট্যাক্স’ বলতে মূলত জামায়াতের আমির বুঝিয়েছেন চাঁদাবাজিকে। তার দল জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে এই চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে আসছে। জামায়াতের বহু নেতাকর্মী গত এক-দেড় বছর সময়ে বিএনপিকে ‘টেম্পু স্ট্যান্ড দখলকারী ও চাঁদাবাজের দল’ হিসেবেই অভিহিত করে আসছে।
জামায়াতের আমির বলেন, ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না। এটাকে নাকি বলে রাজনৈতিক ইজারা। সম্মানিত ভাইয়েরা, আমরা ঘোষণা করেছি— চাঁদা আমরা নেব না এবং চাঁদা কাউকে নিতে দেবো না, ইনশাআল্লাহ। আমরা বলেছি, দুর্নীতি আমরা করব না এবং দুর্নীতি কাউকে করতেও দেবো না।
বিএনপি নির্বাচন সামনে রেখে বহু আগেই যেসব প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার কথা বলেছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘ফ্যামিলি কার্ড’। তারেক রহমান একাধিক বক্তব্যে বারবার এই কার্ডের কথা তুলে ধরেছেন। বলেছেন, নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে পর্যায়ক্রমে ৮০ লাখ কার্ড দেওয়া হবে। এই কার্ডধারীরা প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা পাবেন। তারেক রহমানের বিশ্বাস, এই অর্থ পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে নারীদের সহায়তা করবে।
বিএনপির এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা ওই ধরনের কোনো কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। ২০০০ টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনো কিছুর সমাধান হবে? আর আমার ভাই নাহিদ ইসলাম (এনসিপির আহ্বায়ক) বলেছে, তাতে আবার ভাগ বসিয়ে দেওয়া হবে! খাজনা আগে, তারপর অন্যটা। ২০০০-এর মধ্যে ১০০০ আমার খাজনা। আমাকে আগে দাও, তারপর তোমারটা তুমি বুঝে নাও।
জামায়াতের আমির বক্তব্য দেওয়ার সময় ‘আমি কারও সমালোচনা করতে চাই না’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন। তবে এরপরই আবার বিএনপিকে ইঙ্গিত করে সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে। আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান? আমরা নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চাই না।
তিনি বলেন, যারা ঋণ পরিশোধ করে নাই, সংসদে গেলে আপনার মনে হয় তারা আর ঋণ পরিশোধ করবে? এরা আবারও ঋণ নেবে, এরা আবারও টাকা লুট করবে, এরা আবারও টাকা পাচার করবে বিদেশে। আমরা তো এই বাংলাদেশ চাই নাই। আমরা তো সেই লুটেরাদের বিরুদ্ধেই গণঅভ্যুত্থান করেছি। ফলে নতুন কোনো লুটেরাদের আমরা ক্ষমতায় যেতে দেবো না, বাংলাদেশের জনগণ তাদের ক্ষমতায় যেতে দেবে না।
জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতার মতো তারেক রহমানও বৃহস্পতিবারই শুরু করেছেন নির্বাচনি প্রচার। এ দিন সিলেটের আলিয়া সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে প্রথম নির্বাচনি জনসভা করেন তিনি। এতদিন তারেক রহমানের বক্তব্যে প্রতিপক্ষ নিয়ে খুব একটা সমালোচনা শোনা না গেলেও এ দিন তা শোনা গেছে। একপর্যায়ে কোনো দলের নাম উল্লেখ না করেই তিনি বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া একটি দলের মতো দেশের ভেতরেও একটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তারা ভোট ডাকাতির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’
জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তারেক রহমানের সমালোচনার বিষয়টি স্পষ্ট হয় একটু পরের বক্তব্যেই, যখন তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ‘বেহেশতর টিকিট’ বিক্রির মাধ্যমে কেউ কেউ ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছে।
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক নেতাকে নির্বাচনি জনসংযোগ চালানোর সময় বলতে শোনা গেছে, জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিলে সেটি ইসলাম ধর্মের পক্ষে দাঁড়ানোর সমতুল্য। জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশতের পথ সুগম হবে বলেও তাদের কেউ কেউ বলেছেন ভোটারদের।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে এ প্রসঙ্গ টেনে কথা বলেন তারেক রহমান। টানেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানকেও।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, সবকিছুর মালিক আল্লাহ। কিন্তু কেউ কেউ ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রির মাধ্যমে ভোট চাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই তারা ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তারা কী করবে সবাই বুঝে গেছে। অমুককে দেখেছেন, তমুককে দেখেছেন যারা বলছেন, তাদের একাত্তর সালেই দেশের মানুষ দেখেছে।
এ সময় ফের জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ভোটের বিনিময়ে ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রি এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
তারেক রহমান দিনের শেষ জনসভা করেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে প্রস্তাবিত উপজেলা পরিষদ মাঠে। সেখানেও জামায়াতের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগগুলো ফের তুলে ধরেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, তারা মোবাইল নম্বর নিচ্ছে, বিশেষ করে নিরীহ মা-বোনদের মোবাইল নম্বর নিচ্ছে। তারা বলে, সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে। বিকাশ নম্বর নিচ্ছে, ফোন নম্বর নিচ্ছে, বিকাশ করে টাকা পাঠাচ্ছে। নির্বাচনের আগে যারা মানুষকে এভাবে অর্থ প্রদান করে, আগেই যারা অসৎ কাজ করে, তারা কেমন করে সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে?
ভোটের প্রচারের প্রথম দিনের জনসভায় এসব নেতা অবশ্য নিজেদের নানা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেছেন। বলেছেন, তারা ভোটে জিততে পারলে মানুষের কতটা লাভ হবে। তবে দিন শেষে তিন নেতার পারস্পরিক দোষারোপ করে দেওয়া বক্তব্যগুলোই বেশি আলোচনায় এসেছে।
দলের নেতাকর্মীরাও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এসব বক্তব্যসংবলিত ফটোকার্ডগুলোই বেশি শেয়ার করেছেন। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বাইরে অনেকেই পারস্পরিক দোষারোপকে নতুন সময়ের রাজনীতিতে ‘পুরনো কাসুন্দি’ বলে অভিহিত করেছেন। আগামীতেও নতুন রাজনীতির জায়গায় দোষারোপের এমন রাজনীতি অব্যাহত থাকবে বলেই শঙ্কা তাদের।