গণভোট ছাড়াও সংবিধান পরিষদ ও উচ্চকক্ষের নতুন বিতর্ক জুলাই সনদে
৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও জোটকে নিয়ে প্রায় আট মাসের চেষ্টায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ চূড়ান্ত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। চূড়ান্ত সনদেও প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আকারে স্থান পেয়েছিল দলগুলোর ভিন্নমত। সে অবস্থায় সনদ সইয়ের দুই সপ্তাহ পার না হতেই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ, বিশেষ করে সনদে গণরায় নিতে গণভোটের প্রশ্ন ও বাস্তবায়নের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন নিয়ে নতুন করে দেখা দিয়েছে বিভক্তি।
রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, জুলাই সনদে কিছুটা ঐক্য এলেও সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে তার প্রতিফলন নেই। বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি একে ‘অনৈক্য’ তৈরির প্রয়াস বলেই অভিহিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ খুব বাস্তবসম্মত হয়নি।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে উপদেষ্টা পরিষদের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জমা দেয়। পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে কমিশনের সদস্যদের উপস্থিতিতে এসব সুপারিশের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
যেভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ
সুপারিশে বলা হয়েছে, সরকারপ্রধান জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি করবেন। এরপর জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে যে ৩৬টি সরকারের নির্বাহী আদেশ কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অফিস আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো সরাসরি নির্বাহী বা অফিস আদেশের মাধ্যমে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করবে সরকার।
জুলাই সনদের বাকি ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এর জন্য দুটি বিকল্প পদ্ধতির সুপারিশ রয়েছে ঐকমত্য কমিশনের। দুটি পদ্ধতির জন্যই আয়োজন করতে হবে গণভোট।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, প্রথম বিকল্প হিসেবে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি বিষয়ে আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি, তারা যেন একটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ সংবিধান সংস্কার বিষয়ক আদেশ’ জারি করে। এ আদেশের অধীনে সরকার একটি গণভোটের আয়োজন করবে। সেখানে জনগণের কাছে প্রশ্ন রাখা হবে— ‘আদেশ ও এর তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ৪৮টি সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনগণের সম্মতি আছে কি না।’
গণভোটে সম্মতি পাওয়া গেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জাতীয় সংসদ হিসেবে কার্যকর থাকবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর থাকবে ২৭০ দিন। এ সময়ের মধ্যে পরিষদ জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন করবে।
এর একটি বিকল্প প্রস্তাবও করেছে ঐকমত্য কমিশন। এ প্রস্তাব অনুযায়ীও আগের প্রশ্নেই আয়োজন করা হবে গণভোট। তবে এবারে জুলাই সনদের সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবকে এই গণভোটের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে বিল আকারে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
এবারে গণভোটে জনগণের অনুমোদন মিললে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে দায়িত্ব সম্পন্ন তথা জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলেও গণভোটে অনুমোদিত বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো প্রতিস্থাপন করবে।
গণভোট নিয়ে যা বলছে ঐকমত্য কমিশন
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের মাধ্যমে জনরায় নেওয়ার বিষয়ে আগেই ঐকমত্য হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। তবে গণভোট আয়োজনের তারিখ নিয়ে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য ছিল। ঐকমত্য কমিশনের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে সেই বিভক্তি কাটেনি।
কমিশন সুপারিশ করেছে, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির পর আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনসহ এর আগের যেকোনো দিন গণভোট আয়োজন করতে পারে। ব্যালটের মাধ্যমে হবে এই গণভোট এবং নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যালটে ভোটাররা গোপনে ভোট দেবেন।
ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, গণভোটের জন্য প্রশ্ন থাকবে— ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’