সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধায় আহমেদ রফিককে শেষ বিদায়

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ৪:১৩ অপরাহ্ন, ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | আপডেট: ৭:২২ পূর্বাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হয়েছিল মরদেহ। কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতি কর্মী-রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সেখানে হাজির হয়েছিলেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ তাদের ভালোবাসা আর শেষ শ্রদ্ধায় বিদায় জানালেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিককে।

শনিবার (৪ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে আহমদ রফিকের মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। তাকে শেষ বিদায় জানাতে সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। তারা এই ভাষা সংগ্রামীর কফিনে ফুল দিয়ে জানান শেষ শ্রদ্ধা।

বিএনপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শ্রদ্ধা জানিয়েছে আহমদ রফিকের মরদেহে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আহমদ রফিকের মতো একজন ব্যক্তিত্বের বিদায় দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।


আহমদ রফিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ছায়ানট, উদীচী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানও তাকে শেষ বিদায় জানিয়েছে শহিদ মিনারে।

আহমেদ রফিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আহমদ রফিক ছিলেন অনেক বড় একজন ব্যক্তিত্ব। তার কাছাকাছি আমরা কেউ যেতে পারিনি। তবে আমাদের যদি এগিয়ে যেতে হয়, তাহলে শেকড়ের দিকে যেতে হবে। আর শেকড়ের কাছে যেতে হলে ফিরতে হবে তার কাছেই।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন শ্রদ্ধা জানানোর পর বলেন, আহমদ রফিকের প্রতি সর্বস্তরের মানুষের যে শ্রদ্ধা, তা অনন্য। তার সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমি মনে করি, বাংলা একাডেমি থেকে তার রচনাসমগ্র প্রকাশ করা উচিত। তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি। আমি মনে করি, তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভাষা সংগ্রামী বললে আহমদ রফিকের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় প্রকাশিত হয় না। তিনি ভাষা সংগ্রামী হিসেবে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন ছাত্র থাকা অবস্থায়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তাকে এমবিবিএস পাস করার পর ইন্টার্নও করতে দেওয়া হয়নি। তাতে বোঝা যায়, ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ কতটা গভীর ছিল।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, আহমদ রফিকের পরিচয় অনেক। তিনি লেখক, গবেষক। তিনি কবিতা লিখেছেন। ‘দেশভাগ ফিরে দেখা’ নামে একটি অনন্য পর্যালোচনামূলক গ্রন্থ লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা করে রবীন্দ্রাচার্য উপাধি পেয়েছেন। তার কবিতার বইয়ের নাম ‘নির্বাসিত নায়ক’ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশে সাধারণত দুর্বৃত্তরাই পরিচিত থাকে, যারা নায়ক তারা অপরিচিত থাকেন, নির্বাসিত থাকেন। সেটিই ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক বলেন, ইন্টার্নশিপ করতে না পারায় আহমদ রফিক চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়েও চিকিৎসক হতে পারেননি। তবে তিনি একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি প্রতিকষ্ঠা করেছিলেন। একটি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সমাজ রূপান্তরের যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের সঙ্গে আজীবন যুক্ত ছিলেন আহমদ রফিক। তার যত কাজ, সবই এই সমাজ রূপান্তরের সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন চলাকালে মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আহমদ রফিক। ওই সময় ফজলুল হক হল, ঢাকা হল ও মিটফোর্ডের ছাত্রদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতেন তিনি। সভা-সমাবেশ মিছিলে সক্রিয় ছিলেন প্রতিনিয়ত।

ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ১৯৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আন্দোলনকারী ছাত্রদের মাঝে একমাত্র তার নামেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। আত্মগোপনেও থাকতে হয় তাকে। পরে ১৯৫৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশ্যে বেরিয়ে পড়ালেখায় ফেরেন তিনি। এমবিবিএস ডিগ্রি পাস করলেও পাকিস্তান সরকারের বৈরিতার কারণে ইন্টার্নশিপ করতে না পেরে আর চিকিৎসক পেশায় যাওয়া হয়নি তার। পরে লেখালেখি আর গবেষণাকেই মনোনিবেশ করেন তিনি।