যে বার্তা দিয়ে গেলেন টিআই চেয়ারম্যান

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ১:০৮ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ৬:২৭ পূর্বাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত এসেছে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। ত্যাগ ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা শুধু ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের পথে এক নতুন যাত্রা। কিন্তু এই যাত্রার পথ মসৃণ নয়। রাজনৈতিক সংস্কার এবং নাগরিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্নীতির ক্যানসার এখনো বিদ্যমান।

এই দুর্নীতি রোধ করা ও সংস্কারকে টেকসই করার বার্তা দিয়ে গেলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) চেয়ারম্যান ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ।

ঢাকায় তার প্রথম সফরের শেষ দিনে বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ভ্যালেরিয়াঁ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরপরই দুর্নীতি গায়েব হয়ে যায় না। বরং এটি নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন রূপে টিকে থাকে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে এবং এজন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য।

তিনি বলেন, গত বছর এ দেশে যে পরিবর্তন ঘটেছে তা প্রশংসনীয়। তবে সংস্কারের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখা না গেলে দুর্নীতি আবারও সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে গ্রাস করতে পারে।

ভ্যালেরিয়াঁর বক্তব্যে উঠে আসে সেই চিত্র— কর্তৃত্ববাদী আমলে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। শুধু দেশ নয়, বিশ্ব জুড়ে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসেবে প্রতিবছর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পাচার হয়।

টিআই চেয়ারম্যানের মতে, এই অর্থ “দুর্নীতির বৈশ্বিক অর্থনীতি”কে বেগবান করছে। যে অর্থ জনস্বার্থে ব্যয় হয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারত, তা রূপান্তরিত হচ্ছে অনুপার্জিত ব্যক্তিগত সম্পদে। এর ফলে অর্থনীতির ন্যায়সঙ্গত প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, যদি এই অর্থ পাচার না হতো, বাংলাদেশের জিডিপি আরও বৃদ্ধি পেত এবং তা দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতো।

অর্থপাচার রোধে শুধু সরকার নয়, নাগরিক সমাজকেও আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান ভ্যালেরিয়াঁ। তার মতে, যারা অর্থলুটে জড়িত, তারা নানা আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সুরক্ষার বলয়ে লুকিয়ে থাকে। এই আইনি সুরক্ষার নেপথ্যে কারা কাজ করছে, তা জানতে হবে। তারপর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ প্রত্যার্পণের পথ তৈরি করতে হবে। তবে তিনি সতর্ক করেন, পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। বৈশ্বিক হিসেবে গড়ে পাচার করা অর্থের মাত্র ১ শতাংশই ফেরত আসে। তাই অগ্রাধিকার দিতে হবে পাচারের সুযোগ বন্ধ করায়।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যালেরিয়াঁ বলেন, টিআইবি সবসময় ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করেছে, তাই সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের অস্বস্তি কমবে না। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকারও টিআইবির ওয়াচডগ ভূমিকার কারণে অস্বস্তিতে পড়তে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ভ্যালেরিয়াঁর বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, গত ১৫ বছরে বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহায়তার মোট অঙ্কের দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে পাচার হয়েছে। তার মতে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি সহায়ক কাঠামোতে রূপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থপাচার রোধে দুটি বিষয় জরুরি— প্রথমত, পাচারের সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা; এবং দ্বিতীয়ত, ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল হলেও তা চালিয়ে যাওয়া। তবে সবচেয়ে কার্যকর হলো পাচারের সুযোগ বন্ধ করা, কারণ ফেরত আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত।

ভ্যালেরিয়াঁ মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। শুধু কর্তৃত্ববাদ পতন নয়, সেই শাসনের রেখে যাওয়া দুর্নীতি-প্রশ্রয়ী কাঠামো ভেঙে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলা দরকার। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা যেমন অপরিহার্য, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। তিনি আশাবাদী যে বাংলাদেশ সরকার এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন এবং আন্তরিকভাবে সমাধান খুঁজছে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, সংস্কার কার্যক্রম মাঝপথে থেমে গেলে অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।