এক দফা ঘোষণার পর পরিস্থিতি ছিল ‘ডু অর ডাই’: নাহিদ

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ন, ০১ জুলাই ২০২৫ | আপডেট: ১০:২৭ পূর্বাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে শুরু করে ৩৬ দিনের এক প্রবল আন্দোলনে পতন ঘটে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনের। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু, পাঁচ সপ্তাহের মাথায় তা সরকারের পতন ঘটিয়ে ফেলে।

ওই আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে থাকা নহিদ ইসলাম বলছেন, সরকারি বাহিনীসহ সরকারি দলের অনুসারীদের নির্বিচারে আক্রমণ-হামলাই এই আন্দোলনকে বেগবান করে। বিশেষ করে ১৬ জুলাই গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেয়।

শেষ পর্যন্ত ‘৩৪ জুলাই’ বা ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলছেন, এরপর আর পিছু ফিরে তাকানোর সুযোগ ছিল না। বরং তারা ‘ডু অর ডাই’ পরিস্থিতির মুখে পড়েন।

জুলাই আন্দোলনের বর্ষপূর্তি সামনে রেখে বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল জুলাই গণআন্দোলন, সেখানে অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। কঠোর নজরদারি এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েও বৈষম্যমুক্তির আন্দোলনে ছিলেন অবিচল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আন্দোলনে মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের শুরুর কথা জানিয়ে নাহিদ বলেন, ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হলেও সরকার কোটা বাতিল করে। পরে গত বছরের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ে আবার কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়। সেটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনাস্থা, ক্ষোভ, হতাশা ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করে।

ওই দিনই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হয়। তিন দিন আন্দোলনের পর শুরু হয় ঈদের ছুটি। এর আগেই ৩০ জুনের মধ্যে ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রাখার আলটিমেটাম দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। আর ছুটির মধ্যে আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নিজেদের সংগঠিত করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

নাহিদ বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ও কোটা সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। আমরা সবার সঙ্গে যোগাযোগ করি। অনলাইনে মিটিং করি, ফেসবুকে ক্যাম্পেইন করি। সরকার ৩০ জুনের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না নিলে ১ জুলাই আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে প্রথমবারের মতো কর্মসূচি পালন করি।

এরপর দ্রুতই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। একপর্যায়ে সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। নাহিদ বলেন, আমরা ১৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেই। এ দিন শেখ হাসিনা চীন সফর থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করেন। সবার একটা প্রত্যাশা ছিল, এতদিন টানা আন্দোলন চলেছে, তিনি হয়তো দেশে ফিরে সমাধান দিতে পারেন। কিন্তু দেখা গেল, তিনি কেবল এই আন্দোলনের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিলেন না, বরং একে ‘রাজাকারদের আন্দোলন’ আখ্যা দিলেন।

‘ন্যায্য, ন্যায়ভিত্তিক ও যৌক্তিক আন্দোলন হলেও শেখ হাসিনা এভাবে কথা বলায় সবার আত্মমর্যাদায় লাগে। শিক্ষার্থীরা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায়। পুরোটাই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহির্প্রকাশ। আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগায় সবাই এর বিরুদ্ধে কথা বলেছে। হলে হলে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে শুরু করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখে আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি, ক্যাম্পাসে গিয়েছি। সবাই খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সে রাতে রাস্তায় নেমে আসে,’— বলেন নাহিদ ইসলাম।

আন্দোলনে হামলার বিষয়ে নাাহিদ বলেন, আমরা জানতাম যে আন্দোলনে কোনো একটা পর্যায়ে ছাত্রলীগ বা পুলিশ হামলা করবে। ফলে আন্দোলনে হামলা আসবে বা গ্রেপ্তার হতে পারি— এ রকম মানসিক প্রস্তুতিও আমাদের ছিল। কিন্তু সেদিন (১৫ জুলাই) শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ যে ভয়াবহ হামলা চালায়, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। বিশেষ করে নারীদের ওপর এভাবে হামলা করবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি। আমরা জানতাম ছাত্রলীগ হামলা করবে, কিন্তু এতটা বর্বর হবে, এতটা দমনমূলক হবে, এতটা হিংস্র হবে— এটা আমাদের ধারণাতেও ছিল না।

ওই হামলার প্রতিবাদে পরদিন ১৬ জুলাই ব্যাপক বিক্ষোভ হয় সারা দেশে। সে দিন প্রাণ হারান রংপুরের আবু সাঈদসহ মোট ছয়জন। নাহিদ বলেন, তার মৃত্যুর খবর আমি শহিদ মিনারে প্রথম ঘোষণা দিয়ে বলি, আমাদের এক ভাই শহিদ হয়েছে। আগের দিন আবু সাঈদের সঙ্গে বাকেরের কথা হয়। বাকেরের কাছে আবু সাঈদ জানতে চায় পরদিনের পরিকল্পনা কী? বাকের জানায়, আমরা মাঠে থাকবো যে কোনো মূল্যে। আবু সাঈদ জীবন দিয়ে তার অটল সংকল্প প্রমাণ করছে। সে মাঠ ছাড়েনি, দাঁড়িয়ে ছিল বুলেটের সামনে। ওই ঘটনা আমাদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে, আলোড়িত করে।

ছয়জন নিহতের খবরে ১৬ জুলাই রাতেই নাহিদরা বুঝতে পারেন, আন্দোলন আর কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে হবে বলেই তখন ভাবছিলেন তারা। কিন্তু ১৭ জুলাই আশুরার ছুটি আর এরপর ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় আন্দোলনকারীরা বিপাকে পড়েন। নাহিদের ভাষায়, তাদের প্রস্তুতির ঘাটতির সুযোগ নেয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাস এলাকায় ব্যাপক মাত্রায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবসহ এমন কোনো বাহিনী ছিল না যাদের সেদিন মোতায়েন করেনি।

নাহিদ বলেন, কফিন মিছিল শুরু হলে তারা টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড মারতে শুরু করে। একপর্যায়ে আমরা হলে ফিরে যাই, হল পাড়ায় অবস্থান নিই। সেখানেও ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। দেখি আমাদের লোকবল খুবই কমে গেছে। বুঝতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ওপর সরাসরি আক্রমণ চলছে। তখন অনুরোধ জানাই, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একটা সময় শিক্ষার্থীরা শোকার্ত হয়ে বের হয়ে যায়। তখন ভাবি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে, আমরা মনে হয় আন্দোলনটা আর চালিয়ে যেতে পারব না। আন্দোলন হয়তো এখানেই শেষ